+91 9718147424

Monday, March 18, 2019



কোন উৎসব বা সংস্কৃতির সাথে আমরা পরিচিত সেই আদিম কাল থেকেই। এক এক প্রজাতির ভিন্ন ভিন্ন মানুষ, ভিন্ন ভিন্ন মতবাদে বিশ্বাস করে আর সেই অনু্যায়ী অনেক আচার অনুষ্ঠান, নিয়ম কানুন মেনে চলে। কিছু কিছু ধর্মীয় অনুষ্ঠান শুধুমাত্র সেই সব ধর্মের অনুসারীরাই পালন করে। অন্যান্য ধর্মের অনুসারীরা দেখতে পারে বা ইচ্ছা করলে সেই অনুষ্ঠানের আনন্দ ভাগ করে নিতে পারে। হোলি উৎসব তার মধ্যে একটি। হোলি উৎসবে সাধারণত রঙ বা আবির(এক ধরনের গুড়ো রং) নিয়ে একে অন্যের গাঁয়ে দিয়ে দেয়া হয়। ব্যপারটা অনেকটা রঙ দিয়ে খেলা আর কি।
বাঙালির হোলি বা দোলযাত্রা

স্কন্দপুরাণ গ্রন্থের ফাল্গুনমাহাত্ম্য গ্রন্থাংশে হোলিকা ও প্রহ্লাদের উপাখ্যান বর্ণিত হয়েছে। হোলিকা ছিলেন মহর্ষি কশ্যপ ও তাঁর পত্নী দিতির পুত্র হিরণ্যকশিপুর ভগিনী। ব্রহ্মার বরে হিরণ্যকশিপু দেব ও মানব বিজয়ী হয়ে দেবতাদের অবজ্ঞা করতে শুরু করেন। ভক্ত প্রহ্লাদ অসুর বংশে জন্ম নিয়েও পরম ধার্মিক ছিলেন। তাঁকে যখন বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও হত্যা করা যাচ্ছিল না তখন হিরণ্যকিশপুর বোন হোলিকা প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুনে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন। কারণ হোলিকা এই বর পেয়েছিল যে আগুনে তার কোন ক্ষতি হবে না। কিন্তু অন্যায় কাজে শক্তি প্রয়োগ করায় হোলিকা প্রহ্লাদকে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করলে বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদ অগ্নিকুণ্ড থেকেও অক্ষত থেকে যায় আর ক্ষমতার অপব্যবহারে হোলিকার বর নষ্ট হয়ে যায় এবং হোলিকা পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যায়, এই থেকেই হোলি কথাটির উৎপত্তি।
অন্যদিক বসন্তের পূর্ণিমার এই দিনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কেশি নামক অসুরকে বধ করেন। কোথাও কোথাও অরিষ্টাসুর নামক অসুর বধের কথাও আছে। অন্যায়কারী, অত্যাচারী এই অসুরকে বধ করার পর সকলে আনন্দ করে। এই অন্যায় শক্তিকে ধ্বংসের আনন্দ মহাআনন্দে পরিণত হয়। দোলযাত্রা বা হোলি উৎসব সংক্রান্ত পৌরাণিক উপাখ্যান ও লোককথাগুলি মূলত দুই প্রকার: প্রথমটি দোলযাত্রার পূর্বদিন পালিত বহ্ন্যুৎসব হোলিকাদহন বা নেড়াপোড়া সংক্রান্ত, এবং দ্বিতীয়টি রাধা ও কৃষ্ণের দোললীলা বা ফাগুখেলা কেন্দ্রিক কাহিনী।
বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, ফাল্গুনী পূর্ণিমা বা দোলপূর্ণিমার দিন বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ আবির বা গুলাল নিয়ে রাধিকা ও অন্যান্য গোপীগণের সহিত রং খেলায় মেতেছিলেন। সেই ঘটনা থেকেই দোল খেলার উৎপত্তি হয়। দোলযাত্রার দিন সকালে তাই রাধা ও কৃষ্ণের বিগ্রহ আবির ও গুলালে স্নাত করে দোলায় চড়িয়ে কীর্তনগান সহকারে শোভাযাত্রায় বের করা হয়। এরপর ভক্তেরা আবির ও গুলাল নিয়ে পরস্পর রং খেলেন। দোল উৎসবের অনুষঙ্গে ফাল্গুনী পূর্ণিমাকে দোলপূর্ণিমা বলা হয়। আবার এই পূর্ণিমা তিথিতেই চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম বলে একে গৌরপূর্ণিমা নামেও অভিহিত করা হয়।
অঞ্চল ভেদে হোলি বা দোল উদযাপনের ভিন্ন ব্যাখ্যা কিংবা এর সঙ্গে সংপৃক্ত লোককথার ভিন্নতা থাকতে পারে কিন্তু উদযাপনের রীতি এক ।বাংলায় আমরা বলি ‘দোলযাত্রা’ আর পশ্চিম ও মধ্যভারতে ‘হোলি’,। রঙ উৎসবের আগের দিন ‘হোলিকা দহন’ হয় অত্যন্ত ধুমধাম করে । শুকনো গাছের ডাল, কাঠ ইত্যাদি দাহ্যবস্তু অনেক আগে থেকে সংগ্রহ করে সু-উচ্চ একতা থাম বানিয়ে তাতে অগ্নি সংযোগ করে ‘হোলিকা দহন’ হয় । পরের দিন রঙ খেলা । বাংলাতেও দোলের আগের দিন এইরকম হয় যদিও তার ব্যাপকতা কম।

দোলযাত্রা উৎসবের একটি ধর্মনিরপেক্ষ দিকও রয়েছে। এই দিন সকাল থেকেই নারীপুরুষ নির্বিশেষে আবির, গুলাল ও বিভিন্ন প্রকার রং নিয়ে খেলায় মত্ত হয়। শান্তিনিকেতনে বিশেষ নৃত্যগীতের মাধ্যমে বসন্তোৎসব পালনের রীতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়কাল থেকেই চলে আসছে। দোলের পূর্বদিন খড়, কাঠ, বাঁশ ইত্যাদি জ্বালিয়ে এক বিশেষ বহ্ন্যুৎসবের আয়োজন করা হয়।

যেহেতু উৎসবটি রং নিয়েই তাই কিশোর এবং তরুণদের মধ্যে রঙের প্যাকেট একটি উল্লেখযোগ্য উপহার। এই উৎসবের তাৎপর্য একে অন্যের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সবচেয়ে ভালো উপায় পছন্দের মানুষকে মিষ্টি মুখ করানো। হিন্দু ধর্মের কোনো কোনো গোত্র এই দিনে বিবাহিত মেয়েকে এবং মেয়ের জামাইকে নতুন কাপড় উপহার দেয়। হোলির আগের দিন শ্রীকৃষ্ণের পূজা করা হয়। তখন শুকনো রং ছিটানো হয়। এই হোলির জন্য শাঁখারি বাজারে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার রং আবির এবং বিভিন্ন ওয়াটার গান বিক্রি হয়। হোলির আগের দিন কেবল পরিচিতদের মধ্যেই শুকনো রং ছিটানো হয়। বিভিন্ন ধরনের দেশি-বিদেশি রঙের পসরা নিয়ে বসে দোকানিরা। হোলি খেলার দিন তাঁতিবাজার, সুতারনগর, শাঁখারিবাজার, গোয়ালনগর, রায়সাহেব বাজার, ঝুলবাড়িসহ আরো কিছু কিছু মহল্লার দোকানগুলো হোলি খেলার সময়ে বন্ধ থাকে।

কেউ কেউ হোলি না খেললেও জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অথবা বাড়ির ছাদে উঠে উপভোগ করেন হোলি খেলা। অনেকে বিশ্বাস করে এই রঙ খেলার মাধ্যমে নিজেদের সব অহংকার, ক্রোধ যেনো শেষ হয়ে যায় এবং সকলে মিলেমিশে উপভোগ করে এই হোলি উৎসব বা দোল পূর্ণিমা।

Friday, February 1, 2019

সরস্বতী মূলত বৈদিক দেবী। বেদে সরস্বতী প্রধানত নদীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী। সরস শব্দের অর্থ জল। অতএব সরস্বতী শব্দের আদি অর্থ হলো জলবতী অর্থাৎ নদী। তিনি বিদ্যাদেবী, জ্ঞানদায়িনী, বীণাপাণি, কুলপ্রিয়া, পলাশপ্রিয়া প্রভৃতি নামে অভিহিতা। তাঁর এক হাতে বীণা অন্য হাতে পুস্তক।
সরস্বতী
বৃহস্পতি হচ্ছেন জ্ঞানের দেবতা, বৃহস্পতি পত্নী সরস্বতীও জ্ঞানের দেবী। সরস্বতী নদীর তীরে যজ্ঞের আগুন জ্বেলে সেখানেই ঋষি লাভ করেছিলেন বেদ বা ঋগমন্ত্র। সুতরাং সরস্বতী জ্ঞানের দেবী হিসেবেই পরিচিত হয়েছিলেন এ ধরাতে। কালের বিবর্তনে সরস্বতী তাঁর অন্য বৈশিষ্ট্যগুলো হারিয়ে কেবল বিদ্যাদেবী অর্থাৎ জ্ঞান ও ললিতকলার দেবীতে পরিণত হলেন। সরস্বতী জ্ঞান, সংগীত ও শিল্পকলার দেবী। ঋগবেদে তিনি বৈদিক সরস্বতী নদীর অভিন্ন এক রূপ। পণ্ডিতরা অনেকেই মনে করেন যে সরস্বতী প্রথমে ছিলেন নদী পরে হলেন দেবী। এ বিষয়ে রমেশচন্দ্র দত্ত লিখেছেন, ‘আর্য্যাবর্তে সরস্বতী নামে যে নদী আছে তাই প্রথমে দেবী বলে পূজিত হয়েছিলেন। বর্তমানে গঙ্গা যেমন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপাস্য দেবী হিসেবে পূজা পেয়ে থাকেন তেমনি সরস্বতী হলেন জ্ঞানের দেবী। সরস্বতীর প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত রয়েছে সূর্যাগ্নির জ্যোতিতে। সূর্যাগ্নির তেজ, তাপ ও চৈতন্যরূপে জীবদেহে বিরাজ করায় চেতনা ও জ্ঞানের দেবী সরস্বতী। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে গোলোকে বিষ্ণুর তিন পত্নী লক্ষ্মী, সরস্বতী ও গঙ্গার মধ্যে বিবাদের ফলে গঙ্গার অভিশাপে সরস্বতীর নদী রূপ পাওয়াই হচ্ছে সরস্বতীর পৃথিবীতে দেবীরূপে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার তত্ত্ব।
বর্তমানে সরস্বতীর বাহন হাঁস। পণ্ডিত কলহনের মতে, সরস্বতী দেবী হংসের রূপ ধারণ করে ভেড়গিরি শৃঙ্গে দেখা দিয়েছিলেন। এ ধরনের ধারণা সঙ্গত কারণ হংসবাহনা সরস্বতীর মূর্তি তো প্রচুর পাওয়া যায়। তিনি এ বাহন ব্রহ্মার কাছ থেকে পেয়েছিলেন কিন্তু ব্রহ্মা বা সরস্বতী দেবীর বাহন কিন্তু পাখি নয়। বেদে এবং উপনিষদে হংস শব্দের অর্থ সূর্য। সূর্যে সৃজনী শক্তির বিগ্রহাম্বিতরূপ ব্রহ্মা এবং সূর্যাগ্নির গতিশীল কিরণরূপা ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব শক্তি সরস্বতী দেবীর বাহন হয়েছেন হংস বা সূর্য একেবারেই যুক্তিসঙ্গত কারণে। তবে বৈদিক সাক্ষ্য থেকেই জানা যায় সিংহ ও মেষ সরস্বতী দেবীর আদি বাহন ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেবী দুর্গা সরস্বতী দেবীর কাছ থেকে সিংহ কেড়ে নিলেন আর কার্ত্তিক কেড়ে নিলেন ময়ূর। পরবর্তী সময়ে সরস্বতী দেবী হংসকেই তাঁর চিরস্থায়ী বাহনের মর্যাদা দিলেন। আর সরস্বতীর এ বাহন সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয় জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে সর্বত্রই তাঁর সমান গতি ঠিক যেমনভাবে জ্ঞানময় পরমাত্মা সব জায়গায় বিদ্যমান। মজার ব্যাপার হলো হংস জল ও দুধের পার্থক্য করতে সক্ষম। জল ও দুধ মিশ্রিত থাকলে হাঁস শুধু সারবস্তু দুধ বা ক্ষীরটুকু গ্রহণ করে আর জল পড়ে থাকে। জ্ঞান সাধনায় হাঁসের এ স্বভাব যথেষ্ঠ তাৎপর্য বহন করে। তাই বিদ্যাদেবীর বাহন হিসেবে হাঁসকে খুব ভালোই মানায়।
হাতে বীণা ধারণ করেছেন বলেই তাঁর অপর নাম বীণাপাণি। বীণার সুর মধুর। পূজার্থী বা বিদ্যার্থীর মুখ নিঃসৃত বাক্যও যেন মধুর হয় এবং জীবনও মধুর সংগীতময় হয় এ কারণেই মায়ের হাতে বীণা।
হিন্দুদের দেবী হয়েও বৌদ্ধ বা জৈনদের কাছ থেকেও পূজা পেয়েছেন সরস্বতী। অনেক বৌদ্ধবিহারেও সরস্বতীর মূর্তি পাওয়া যায়। জৈনদের ২৪ জন শাসনদেবীর মধ্যে সরস্বতী একজন এবং ষোলজন বিদ্যাদেবীর মধ্যে অনন্যা মা সরস্বতী। সরস্বতী নদীর তীরেই বৈদিক এবং ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির উদ্ভব। শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে শ্রীপঞ্চমীর দিন সকালেই সরস্বতী পূজা সম্পন্ন হয়। সরস্বতী পূজা সাধারণ পূজার নিয়মানুসারেই হয়। তবে এই পূজায় আলাদা কিছু সামগ্রী যেমন : অভ্র-আবির, আমের মুকুল, দোয়াত-কলম ও যবের শিষ ছাড়াও লাগে বাসন্তী রঙের গাঁদা ফুল।
পূজার দিন লেখাপড়া একেবারেই নিষেধ থাকে। পূজার পরে দোয়াত-কলম পুস্তক ও বাদ্যযন্ত্রের পূজারও প্রচলন আছে। এ দিনেই অনেকের হাতেখড়ি দেওয়া হয়। পূজা শেষে অঞ্জলি দেওয়াটা খুব জনপ্রিয়। আর যেহেতু সরস্বতী বিদ্যার দেবী তাই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এ উৎসব অনেক বড় করে পালিত হয়। আর সেখানে দল বেঁধে অঞ্জলি দেয় শিক্ষার্থীরা। মানুষের ভেতরের পশুকে নিবৃত্ত করে জ্ঞান দান করেন বিদ্যার দেবী সরস্বতী।
সনাতন ধর্মের এ অন্যতম ধর্মীয় উৎসব এবার আবার ফাল্গুনের প্রথম দিনে হওয়াতে বসন্তের বাসন্তী আমেজের সাথে ধর্মীয় উৎসবের আমেজ মিলেমিশে একাকার।
মা সরস্বতী আমাদের আশীর্বাদ করছেন- জীবনকে শুভ্র ও পবিত্র রাখ। সত্যকে আঁকড়ে রাখ। মূল গ্রন্থের বাণী পালন কর। জীবন ছন্দময় কর। স্বচ্ছন্দে থাক।’ এ বিশ্বের সবাই মনের কলূষতা দূর করে জ্ঞানের আলোয় নিজেকে ও অন্যকে আলোকিত করুক মা সরস্বতীর কাছে এই প্রার্থনা ।

* সরস্বতী পূজায় প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির তালিকা*

১. পলাশ ফুল,
২. কুল(বইড়),
৩. ঘট ১টি ও আমের সখা ১টি,
৪. প্রদীপ ৫-৭টি,
৫. ডাব ১টি,
৬. ধুপচি ১টি,
৭. চাইলন ১টি,
৮. পাখা ১টি,
৯. আলতা ফাইলা ১সেট,
১০. তিল,হরতকী,
১১. পান,সুপারি,
১২. ঘি,মধু,চিনি,দুধ,দই,
১৩. বাতাসা,
১৪. ফল-মূল,
১৫. কলা ৩ছুরি,
১৬. গামছা ১টি,
১৭. শাড়ী ১টি,
১৮. সিঁন্দুর ১কৈটা ও ৩ প্যাক,
১৯. ইকরা ১টি,
২০. পঞ্চশস্য, চন্দন
২১. খাতা ও কলম,
২২. ধুপ ও কর্পুর,
২৩. যাতা ও যাতি,
২৪. চিড়া,
২৫. ভোগের দ্রব্য,
২৬. সুতা,
২৭. ৮ প্রকার খড়ি(আম, জাম, পলাশ, বট, পাখুর, কুল, ডুমুর ও চন্দন),
২৮. হোম করার জন্য বালু, পাটকাঠি
ইত্যাদি ।

Thursday, January 31, 2019


দেবী সরস্বতী


সরস্বতী পূজা কী ও কেন? 
কোনো হিন্দুকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়
যে, দেবী সরস্বতী কে ? বলবে, জ্ঞানের দেবী, বিদ্যার দেবী। আর ? আর কোনো তথ্য তার কাছে নেই। এরপর হয়তো দু’চার জন হিন্দু বলবে যে,
সরস্বতী ব্রহ্মার স্ত্রী; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ব্রহ্মার স্ত্রী
বলে কিছু নেই বা কিছু হয় না।

তাহলে- দেবী সরস্বতীকে ?
পরমব্রহ্ম বা ঈশ্বরের সৃষ্টিকারী রূপের
নাম ব্রহ্মা আর ব্রহ্মার নারী শক্তির নাম সরস্বতী; এর মানে হলো সরস্বতীই ব্রহ্মা, আর ব্রহ্মা মানেই
পরমব্রহ্ম বা ঈশ্বর, অর্থাৎ সরস্বতীই পরমেশ্বর বা ঈশ্বর। অনেকেই সরস্বতীকে ছোট দেবী হিসেবে
মনে করে, প্রকৃতপক্ষে দেব-দেবীদের মধ্যে ছোট
বা বড় বলে কিছু নেই, সব দেব- দেবী ই সমান; সুতরাং সরস্বতী, ঈশ্বরেরই একটা রূপের নাম এবং স্ত্রীলিঙ্গে স্বয়ং ঈশ্বরীরূপে সরস্বতীই পরমব্রহ্ম বা ঈশ্বর।

সরস্বতীর গায়ের রং সাদা কেন ?
দেবী সরস্বতীর শুভ্রমূর্তি নিষ্কলুষ চরিত্রের প্রতীক;
এটা এই শিক্ষা দেয় যে, প্রত্যেক ছেলে মেয়েকে হতে হবে নিষ্কলুষ নির্মল চরিত্রের
অধিকারী; যে ছেলে মেয়ে বাল্যকাল থেকে নিজেকে নিষ্কলুষ রাখার চেষ্টা করবে, সে যে সারাজীবন তার সকল কর্ম ও চিন্তায় নিজেকে নিষ্কলুষ রাখতে পারবে, তাতে তো
আর কোনো সন্দেহ নেই।

সরস্বতীর সাথে রাজহাঁস থাকে কেন ?
রাজহাসেঁর মধ্যে এমন ক্ষমতা আছে যে,
এক পাত্রে থাকা জল মিশ্রিত দুধের থেকে সে
শুধুমাত্র দুধ শুষে নিতে পারে। সরস্বতী যেহেতু
শিক্ষার্থী সংশ্লিষ্ট পূজা, সেই প্রেক্ষাপটে এটা বলা
যেতে পারে যে, রাজহাসেঁর এই তথ্য শিক্ষার্থীদেরকে এই শিক্ষা দেয় যে, সমাজে ভালো মন্দ সব কিছুই থাকবে, তার মধ্যে থেকে তোমাদেরকে শুধু ভালোটুকু শুষে নিতে হবে।
অধিকাংশ হিন্দু ছেলে-মেয়েরা যে
মেধাবী এবং চরিত্রবান বা চরিত্রবতী, সরস্বতী পূজা এবং তার রাজহাঁসজনিত এই শিক্ষাই তার কারণ।

দেবী সরস্বতীর হাতে বীণা থাকে কেন ?
এর কারণ হচ্ছে-হিন্দু ধর্ম হলো নাচ, গান সমৃদ্ধ
শিল্পকলার ধর্ম; যা সামাজিক বাস্তবতাকে সম্পূর্ণভাবে সাপোর্ট করে। কারণ, প্রত্যেক ছেলে
মেয়েই কোনো না কোনো প্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহন করে; প্রকৃতির ধর্ম হিসেবে হিন্দুধর্ম এই সামাজিক
বাস্তবতাকে স্বীকার করে, এই কারণেই দেবী সরস্বতীর হাতের বীণা হচ্ছে সেই শিল্পকলার প্রতীক। আর এটা সুধীজন স্বীকৃত।

Monday, January 28, 2019


দেবী সরস্বতী

আমরা যে দেবী সরস্বতীকে হিমালয়কন্যা পার্বতীর কন্যা ও লক্ষ্মী-কার্তিক-গণেশের সহোদরা ভগ্নীরূপে দেখি, সেটা নিতান্তই বাঙালিদের ঘরোয়া মনগড়া গল্প, এর পিছনে কোন শাস্ত্রীয় অনুমোদন নেই। সরস্বতী সৃষ্টিদেবতা ব্রহ্মার সহধর্মিণী এবং বিষ্ণুপত্নী লক্ষ্মী ও মহেশ্বরজায়া পার্বতীর সঙ্গে একযোগে ত্রিদেবী নামে পরিচিতা। সরস্বতী প্রাচীনতম হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বেদসমূহের প্রসূতি। ঋগ্বেদে বাগ্দেবী ত্রয়ীমূর্তি - ভূ: ভুব: স্ব:, জ্ঞানময়ীরূপে সর্বত্রব্যাপিনী। বিশ্বভূবন প্রকাশ তারই জ্যোতিতে। হৃদয়ে সে আলোকবর্তিকা যখন প্রজ্বলিত হয়, তখন জমাট বাধা অজ্ঞানতারূপ অন্ধকার যায় দূর হয়ে। অন্তরে, বাইরে সর্বত্র তখন জ্বলতে থাকে জ্ঞানের পুণ্য জ্যোতি।

এই জ্যোতিজ্ঞানই ব্রহ্মজ্ঞান, এই জ্যোতিই সরস্বতী। আলোকময়ী, তাই তিনি সর্বশুক্লা। তিন গুণের মধ্যে তিনি সত্ত্বগুণময়ী, অনন্ত জ্ঞানময় ঈশ্বরের বাক্শক্তির প্রতীক বাগ্দেবী। গতিময় জ্ঞানের জন্যই ঋগ্বেদে তাঁকে নদীরূপা কল্পনা করা হয়েছে, যিনি প্রবাহরূপে কর্মের দ্বারা মহার্ণব বা অনন্ত সমুদ্রে মিলিত হয়েছেন। কল্যাণময়ী নদীতটে সাম গায়কেরা বেদমন্ত্র উচ্চারণে ও সাধনে নিমগ্ন হতো। তাদের কণ্ঠে উদ্গীত সাম সঙ্গীতের প্রতীকী বীণা দেবীর করকমলে। সরস্বতী বিধৌত ব্রহ্মাবর্ত ভূমি বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত আশ্রয় করে সাধনা করতে আশ্রমবাসী ঋষিগণ। সেই ভাবটি নিয়েই দেবী 'পুস্তক হস্তে', গ্রন্থ রচনার সহায়ক লেখনীটিও তাঁর সঙ্গে।
 মার্কণ্ডেয় পুরাণে শ্রীশ্রীচণ্ডী উত্তরলীলায় শুম্ভ নিশুম্ভ নামক অসুরদ্বয়কে বধ করার সময় দেবীর যে মূর্তির কল্পনা করা হয়েছিল তা ছিল মহাসরস্বতী। এ মূর্তি অষ্টভূজা - বাণ, কার্মূক, শঙ্খ, চক্র, হল, মুষল, শূল ও ঘন্টা ছিল তাঁর অস্ত্র। তাঁর এই সংহারলীলাতেও কিন্তু জ্ঞানের ভাবটি হানি ঘটেনি, কেননা তিনি 'একৈবাহং জগত্যত্র দ্বিতীয়াকা মমাপরা' বলে মোহদুষ্ট শুম্ভকে অদ্বৈত জ্ঞান দান করেছিলেন।
 স্কন্দ পুরাণে প্রভাসখণ্ডে দেবী সরস্বতীর নদীরূপে অবতরণের কাহিনী বর্ণিত আছে। বায়ু পুরাণ অনুযায়ী কল্পান্তে সমুদয় জগৎ রুদ্র কর্তৃক সংহৃত পুনর্বার প্রজাসৃষ্টির জন্য প্রজাপতি ব্রহ্মা নিজ অন্তর থেকেই দেবী সরস্বতীকে সৃষ্টি করেন। সরস্বতীকে আশ্রয় করেই ব্রহ্মার প্রজাসৃষ্টি সূচনা। গরুড় পুরাণে সরস্বতী শক্তি অষ্টবিধা। শ্রদ্ধা, ঋদ্ধি, কলা, মেধা, তুষ্টি, পুষ্টি, প্রভা ও স্মৃতি। তন্ত্রে এই অষ্টশক্তি যথাক্রমে যোগ, সত্য, বিমল, জ্ঞান, বুদ্ধি, স্মৃতি, মেধা ও প্রজ্ঞা। তন্ত্র শাস্ত্রমতে সরস্বতী বাগীশ্বরী - অং থেকে ক্ষং পঞ্চাশটি বর্ণে তাঁর দেহ। আবার পদ্মপুরাণ-এ উল্লিখিত সরস্বতীস্তোত্রম্-এ বর্ণিত হয়েছে - শ্বেতপদ্মাসনা দেবী শ্বেতপুষ্পোপশোভিতা শ্বেতাম্বরধরা নিত্যা শ্বেতগন্ধানুলেপনা শ্বেতাক্ষসূত্রহস্তা চ শ্বেতচন্দনচর্চিতা শ্বেতবীণাধরা শুভ্রা শ্বেতালঙ্কারভূষিতা ইত্যাদি। এর অর্থ দেবী সরস্বতী শ্বেতপদ্মে আসীনা, শ্বেতপুষ্পে শোভিতা, শ্বেতবস্ত্র-পরিহিতা এবং শ্বেতগন্ধে অনুলিপ্তা।
অধিকন্তু তাঁহার হস্তে শ্বেত রুদ্রাক্ষের মালা; তিনি শ্বেতচন্দনে চর্চিতা, শ্বেতবীণাধারিণী, শুভ্রবর্ণা এবং শ্বেত অলঙ্কারে ভূষিতা। ধ্যান বা স্তোত্রবন্দনায় উল্লেখ না থাকলেও সরস্বতী ক্ষেত্রভেদে দ্বিভূজা অথবা চতুর্ভূজা এবং মরালবাহনা অথবা ময়ূরবাহনা। উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে সাধারণত ময়ূরবাহনা চতুর্ভূজা সরস্বতী পূজিত হন। ইনি অক্ষমালা, কমণ্ডলু, বীণা ও বেদপুস্তকধারিণী। বাংলা তথা পূর্বভারতে সরস্বতী দ্বিভূজা ও রাজহংসের পৃষ্ঠে আসীনা। রাজহংস কেন সরস্বতীর বাহন? কেননা জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে সর্বত্রই হাঁসের সমান গতি, যেমন জ্ঞানময় পরমাত্মা সর্বব্যাপী - স্থলে, অনলে, অনিলে সর্বত্র তাঁর সমান প্রকাশ। হংস জল ও দুধের পার্থক্য করতে সক্ষম। জল ও দুগ্ধ মিশ্রিত থাকলে হাঁস শুধু সারবস্তু দুগ্ধ বা ক্ষীরটুকুই গ্রহণ করে, জল পড়ে থাকে। জ্ঞান সাধনার ক্ষেত্রেও হংসের এ স্বভাব তাৎপর্য বহন করে। সংসারে নিত্য ও অনিত্য দুটি বস্তুই বিদ্যমান। বিবেক বিচার দ্বারা নিত্য বস্তুর বিদ্যমানতা স্বীকার করে তা গ্রহণ শ্রেয়, অসার বা অনিত্য বস্তু সর্বতোভাবে পরিত্যাজ্য। হাঁস জলে বিচরণ করে কিন্তু তার দেহে জল লাগে না। মহাবিদ্যা প্রতিটি জীবের মধ্যে থেকেও জীবদেহের কোন কিছুতে তাঁর আসক্তি নেই, তিনি নির্লিপ্তা। হিন্দুদের দেবী হওয়া সত্ত্বেও বৌদ্ধ ও জৈনদের কাছেও পুজো পেয়েছেন সরস্বতী। গান্ধারে পাওয়া বীণাবাদিনী সরস্বতীর মূর্তি থেকে বা সারনাথে সংরক্ষিত মূর্তিতে এর প্রমাণ মেলে। অনেক বৌদ্ধ উপাসনালয়ে পাথরের ছোট ছোটো মূর্তি আছে তাতে সরস্বতী বীণা বাজাচ্ছেন, অবিকল সরস্বতীমূর্তি। মথুরায় জৈনদের প্রাচীন কীর্তির আবিষ্কৃত নিদর্শনে সরস্বতীর যে মূর্তি পাওয়া গেছে সেখানে দেবী জানু উঁচু করে একটি চৌকো পীঠের উপর বসে আছেন, এক হাতে বই। শ্বেতাম্বরদের মধ্যে সরস্বতী পুজোর অনুমোদন ছিল। জৈনদের চব্বিশজন শাসনদেবীর মধ্যে সরস্বতী একজন এবং ষোলজন বিদ্যাদেবীর মধ্যে অন্যতমা হলেন সরস্বতী। শ্বেতাম্বর ও দিগম্বর উভয় জৈন সম্প্রদায়েই সরস্বতীর স্থান হয়ে গেল ব্রাহ্মণ্য ধর্ম থেকে গৃহীতা একজন প্রধান দেবীরূপে। সরস্বতী শব্দের দুই অর্থ - একটি ত্রিলোক্য ব্যাপিনী সূর্যাগ্নি, অন্যটি নদী। সরস্‌ + বতী = সরস্বতী, অর্থ জ্যোতির্ময়ী।
আবার সৃ ধাতু নিস্পন্ন করে সর শব্দের অর্থ জল। অর্থাৎ যাতে জল আছে তাই সরস্বতী। ঋগ্বেদে আছে 'অম্বিতমে নদীতমে দেবীতমে সরস্বতী', সম্ভবত সরস্বতী নদীর তীরেই বৈদিক এবং ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির উদ্ভব। শুধু বৈদিক যুগেই নয়, পরবর্তীকালে মহাভারত, পুরাণ, কাব্যে পূতসলিলা সরস্বতীর মহিমা বর্ণিত হয়েছে। সরস্বতী নদীর উৎপত্তিস্থল ছিল হিমালয়ের সিমুর পর্বতে, সেখান থেকে পাঞ্জাবের আম্বালা জেলার আদবদ্রী নামক স্থানে সমভূমিতে অবতরণ করেছিল। যে প্রসবণ থেকে এই নদীর উৎপত্তি তা ছিল প্লক্ষ্ণাবৃক্ষের নিকটে, তাই একে বলা হতো প্লক্ষ্ণাবতরণ। ঋগ্বেদের যুগে গঙ্গা যমুনা ছিল অপ্রধান নদী, সরস্বতী নদীই ছিল সর্বপ্রধান ও সর্বাপেক্ষা প্রয়োজনীয়। এর তীরে ছিল প্রসিদ্ধ তীর্থভূমি। সরস্বতী ও দৃষদ্বতীর মধ্যস্থান দেবনির্মিত স্থান হিসেবে বিবেচ্য হত। ব্রাহ্মণ ও মহাভারতে উল্লেখিত সারস্বত যজ্ঞ এই নদীর তীরে অনুষ্ঠিত হত। মহাভারত রচনা হওয়ার আগেই রাজপুতানার মরুভূমিতে সরস্বতী নদী অদৃশ্য হয়ে গেলেও কয়েকটি স্রোতধারা অবশিষ্ট ছিল। এই স্রোতধারা হল চমসোদ্ভেদ, শিবোদ্ভেদ ও নাগোদ্ভেদ। রাজস্থানের মরুভূমির বালির মধ্যে চলুর গ্রামের নিকটে সরস্বতী অদৃশ্য হয়ে ভবানীপুরে দৃশ্য হয়, আবার বলিচ্ছপুর নামকস্থানে অদৃশ্য হয়ে বরখের নামক স্থানে দৃশ্য হয়। তান্ডমহাব্রাহ্মণে সরস্বতী নদীর উৎপত্তিস্থল হিসাবে প্লক্ষ্ণপ্রস্রবণ ও বিনাশস্থল হিসেবে বিনশনের নামোল্লেখ আছে।
দেবী সরস্বতী
 লাট্যায়ণের শ্রৌতসূত্র মতে, সরস্বতী নামক নদী পশ্চিম মুখে প্রবাহিতা, তার প্রথম ও শেষভাগ সকলের প্রত্যক্ষ গোচর, মধ্যভাগ ভূমিতে নিমগ্ন যা কেউ দেখতে পায় না, তাকেই বিনশন বলা হয়। অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণের মতে, বৈদিক সরস্বতীর লুপ্তাবশেষ আজও কচ্ছ ও দ্বারকার কাছে সমুদ্রের খাড়িতে গিয়ে মিলিত হয়েছে। সরস্বতী নদীর বিনাশ ঘটেছিল অবশ্যই বৈদিক যুগের শেষভাগে, একমতে খ্রিস্টের দেড় হাজার বছরেরও আগে। মহাভারতে আছে যে নিষাদদের চোখের আড়ালে থাকার জন্য বিনাশণ নামক স্থানে মরুভূমিতে অদৃশ্য হয়েছে। নদীর স্থানীয় নামই এই ঐতিহ্য বহন করছে। আবার অনেকে বলেন, সিন্ধুনদই সরস্বতী। সরস্বতী ও সিন্ধু দুটি শব্দের অর্থই নদী। সরস্বতী বৈদিক দেবী হলেও সরস্বতী পূজার বর্তমান রূপটি আধুনিককালে প্রচলিত হয়েছে। প্রাচীনকালে তান্ত্রিক সাধকরা সরস্বতীসদৃশা দেবী বাগেশ্বরীর পূজা করতেন বলে জানা যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে পাঠশালায় প্রতি মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে ধোয়া চৌকির ওপর তালপাতার দোয়াত-কলম রেখে পূজা করার প্রথা ছিল। শ্রীপঞ্চমী তিথিতে ছাত্ররা বাড়িতে বাংলা বা সংস্কৃত গ্রন্থ, শ্লেট, দোয়াত ও কলমে সরস্বতী পূজা করত। ইংরেজি ম্লেচ্ছ ভাষা হওয়ায় সরস্বতী পূজার দিন ইংরেজি বইয়ের পূজা নিষিদ্ধ ছিল। আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজার প্রচলন হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সরস্বতী দেবী হলেও মেয়েরা অঞ্জলি দিতে পারত না। কিছু পণ্ডিতের মতে সমাজপতিরা ভয় পেতেন হয়তো এই সুযোগে ধর্মের নামে মেয়েরা দাবি করে বসেন লেখাপড়ার স্বাধীনতা ! শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে, শ্রীপঞ্চমীর দিন সকালেই সরস্বতী পূজা সম্পন্ন করা হয় সাধারণ পূজার আচারাদি মেনে। তবে এই পূজায় কয়েকটি বিশেষ উপাচার বা সামগ্রীর প্রয়োজন হয়, যেমন অভ্র-আবির, আমের মুকুল, দোয়াত-কলম ও যবের শিষ, বাসন্তী রঙের গাঁদা ফুল। লোকাচার অনুসারে ছাত্রছাত্রীরা পূজার আগে কুল ভক্ষণ করে না। পূজার দিন লেখাপড়া নিষেধ থাকে। যথাবিহিত পূজার পর লক্ষ্মী, নারায়ণ, লেখনী-মস্যাধার, পুস্তক ও বাদ্যযন্ত্রেরও পূজা করা হয়। পূজার শেষে পুষ্পাঞ্জলি। পরদিন সকালে ফের পূজার পর চিড়া ও দই মেশানো দধিকরম্ব বা দধিকর্মা নিবেদন করে পূজা সমাপ্ত হয় ও সন্ধ্যায় প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। বসন্ত পঞ্চমীতে অনুষ্ঠিত সরস্বতী পূজার পরের দিনটি বাংলায় শীতলষষ্ঠী। কোনো কোনো পরিবারে এদিন অরন্ধন পালন ও 'গোটা-সেদ্ধ' খাওয়ার প্রথা আছে। অষ্টাদশ শতকে নদীয়ার মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের সভাকবি ভারতচন্দ্র রায় গুণাকরের অন্নদামঙ্গলে ত্রিপদী ছন্দে সরস্বতী বন্দনায় দেবীর প্রতি ভক্তের শ্রদ্ধার নিদর্শন মেলে সেই সময়ের বঙ্গভূমিতে। উর দেবি সরস্বতি স্তবে কর অনুমতি বাগীশ্বরি বাক্যবিনোদিনি শ্বেতবর্ণ শ্বেতবাস শ্বেত বীণা শ্বেত হাস শ্বেতসরসিজনিবাসিনি বেদ বিদ্যা তন্ত্র মন্ত্র বেণু বীণা আদি যন্ত্র নৃত্য গীত বাদ্যের ঈশ্বরী গন্ধর্ব্ব অপ্সরাগণ সেবা করে অনুক্ষণ ঋষি মুনি কিন্নরকিন্নরী আগমের নানা গ্রন্থ আর যত গুণপন্থ চারিবেদ আঠার পুরাণ ব্যাস-বাল্মীকাদি যত কবি সেবে অবিরত তুমি দেবি প্রকৃতি প্রধান ছত্রিশ রাগিনী মেলে ছয় রাগ সদা খেলে অনুরাগ সে সব রাগিণী সপ্ত স্বর তিন গ্রাম মূর্চ্ছনা একুশ নাম শ্রুতিকলা সতত সঙ্গিনী তান মান বাদ্য ভাল নৃত্যগীত ক্রিয়া কাল তোমা হৈতে সকল নির্ণয় যে আছে ভুবন তিনে তোমার করুণা বিনে কাহার শকতি কথা কয় তুমি নাহি চাহ যারে সবে মূঢ় বলে তারে ধিক্ ধিক্ তাহার জীবন তোমার করুণা যারে সবে ধন্য বলে তারে গুণীগণে তাহার গণন দয়া কর মহামায়া দেহ মোরে পদচ্ছায়া পূর্ণ কর নূতন মঙ্গল আসরে আসিয়া উর নায়কের আশা পূর দূর কর অজ্ঞান সকল কৃষ্ণচন্দ্র নরপতি গীতে দিলা অনুমতি করিলাম আরম্ভ সহসা মনে বড় পাই ভয় না জানি কেমন হয় ভারতের ভারতী ভরসা আজ শ্রীপঞ্চমীর পুণ্যাহে সকলের পেটে থাক খিচুড়ি ও লাবড়া। ছেলেমেয়েরা একসাথে গল্পগাছা করার একটু ছাড়পত্র পাক। সামনে বড় পরীক্ষা আসছে, তার জন্যে প্রস্তুতি হোক সুন্দর - এছাড়া ছা-পোষা গেরস্থ আমার আর কী চাইবার আছে?
সনাতন ধর্মমতে কালী বা কালিকা হচ্ছেন শক্তির দেবী। কাল্ শব্দটির অর্থ সময় হতে পারে, আবার এটা রং ও বুঝাতে পারে কাল তথা কৃষ্ণবর্ণ, এর অর্থ হতে পারে মৃত্যুবোধক। যেমন আমরা বলি- ‘কাল’এসে গেছে, মৃত্যুর সময় সমাসন্ন, মহাকাল এসে গেছে। দেবীর নাম মহাকালীও বটে।
কালী বা কালিকা
কালীর নাম কাল না হয়ে কালী হলো এ কারণে যে শিবের অপর নাম কাল, যা অনন্ত সময়কাল বোধক। কালী হচ্ছে কাল এর স্ত্রীলিঙ্গ বোধক। মা কালী মা দুর্গা বা পার্বতী’র সংহারী রূপ। ঊনবিংশ শতাব্দীর সংস্কৃত ভাষার বিখ্যাত অভিধান শব্দকল্পদ্রুম এ বলা হচ্ছে ‘কাল শিবহ্। তস্য পত্নতি কালী।’ অর্থাৎ শিবই কাল বা কালবোধক। তাঁর পত্নী কালী। কালী হচ্ছেন মা দুর্গার বা পার্বতীর অপর ভয়াল রূপ। তিনি সময়ের, পরিবর্তনের, শক্তির, সংহারের দেবী। তিনি কৃষ্ণবর্ণা বা মেঘবর্ণা এবং ভয়ংকরা। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ভয়ংকরেরও পূজা করেন। তিনি অশুভ শক্তি’র বিনাশ করেন। তাঁর এই শক্তি’র পূজা সনাতন সমাজকে প্রভাবিত করেছে, বিশুদ্ধ শক্তি সঞ্চারিত করেছে, অন্তর শুদ্ধি দিয়েছে, দুর্দিনের দুর্বলতায় সাহস দিয়েছে। শাক্ত সৃষ্টিতত্ত্ব মতে এবং শাক্ত-তান্ত্রিক বিশ্বাস মতে তিনিই পরম ব্রহ্ম। কালীকে এই সংহারী রূপের পরেও আমরা মাতা সম্বোধন করি। তিনি সন্তানের কল্যাণ চান তিনি মঙ্গলময়ী, তিনি কল্যাণী এটাই তাঁর প্রতি সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসের মূল আস্থা ও নির্যাস। একটা ধারণা আমাদের মধ্যে বর্তমান আছে যে, শিব পার্বতীর স্বামী এবং মা কালীর ভাসুর। কথাটি আদৌ সত্য নয়। অসুররক্ত স্নাত কোপান্বিতা এই দেবীর সংহারী মূর্তিতে কিছুটা নিবৃত্ত ও প্রশমিত করতে শিব তাঁর চলার পথে শুয়ে থাকলেন। দেবী পথ চলতে গিয়ে তাঁর স্বামী শিবকে পায়ে মাড়ালেন। এই পাদস্পৃষ্ঠতার লজ্জায় ও তার অনুশোচনায় মায়ের জিহ্বায় কামড় পড়লো। তাঁর কোপভাব স্থিমিত হলো, ছেদ পড়লো।
কালীকে যদি, বলি কল্পনা তবে সেই কল্পনাও ধর্মে বর্ণিত হয়েছে বর্তমান বিজ্ঞানের ধারণার হাজার হাজার বছর আগে। এ কথা বিজ্ঞান প্রথমতঃ স্বীকার করে যে, সৃষ্টির আদি যুগে অনন্ত ব্রহ্মা- ছিল নিকষ কালো অন্ধকারে নিমজ্জিত, নিশ্চিদ্র তমসায় আবৃত, অনন্ত সৃষ্টিতে তখনো আলোর সৃষ্টি হয়নি। রবি শশী তারা বা কোন আলোকবর্তিকা তখনো ছিলনা। বিজ্ঞান মতে আলোর সৃষ্টির আগে অন্ধকার ছিল। এ বর্ণনায় কান পেতে শুনলে আমরা দেখি কৃষ্ণবর্ণা মা কালী সেই যুগের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ধর্ম ও বিজ্ঞানের এখানে অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। দ্বিতীয়তঃ বিজ্ঞানের ‘বিগ্ ব্যাংগ্ তত্ত্ব’ মতে কাল বা সময় তখন সবে মাত্র সৃষ্টি হয়েছে, কাল্ বা সময় যখন সৃষ্টি হলো তথা যে দিন ভূমিষ্ঠ হলো, সেদিন নির্ধারিত হলো সেই কালেরও শেষ আছে, সংহার আছে। বিশ্ব ব্রহ্মা- সৃষ্টি যখন হয়েছে সময় এলে তা ধ্বংসও হবে। তার লয়ও অবশ্যম্ভাবী। কালী এই সংহারের প্রতিভূ, তিনি কাল এর জীবন্তকালের সীমারেখার নির্ধারণকৃত। তৃতীয়তঃ বিজ্ঞানীরা সৃষ্টির প্রথম যুগের মহাবিশ্বের যে বর্ণনা দেন তা ভয়াল ভীষণ তার মধ্যে সৃষ্টির চাইতে ধ্বংসই বেশী। প্রবল সংহারের মধ্যে দিয়ে অনন্ত ব্রহ্মা-ের সৃষ্টি। মা কালী সেই সংহারের প্রতিভূ তিনি ভয়াল দর্শনা সংহারের দেবী। সৃষ্টির সেই ক্রমবিকাশের যুগেই মা কালী মা জগজ্জননী প্রবল সংহারের মধ্যে দিয়েই তাঁর সৃষ্টি ও তাঁর কল্যাণময় রূপকে আমাদের কাছে তুলে ধরেছেন। মা কালী যুগপৎ কাল, কৃষ্ণবর্ণ এবং সংহারের দেবী। কিছুই ছিল না, তখন দেবী ছিলেন। এই মাতৃপূজা মাতৃমূর্তি হিন্দুধর্মের আদিকথা।অথর্ব বেদ-এ কালীর উল্লেখ থাকলেও বিশেষ হিসেবে কথক গ্রাহ্য সূত্রে(১৯.৭) প্রথমবার কালীর উল্লেখ ঘটে। কালী অগ্নিদেবের সাতটি জিহ্বার একটি নাম, অগ্নিদেব হচ্ছেন আগুনের ঋগ্বেদীয় দেবতা যার উপস্থিতি মুণ্ডুক উপনিষদে বর্তমান; তবে এখানে কালী বলতে দেবী কালীকেই উল্লেখ করা হয়েছে এটা নির্ণীত করা কঠিন। কালী’র বর্তমান রূপের উপস্থিতি আমরা পাই মহাভারতের সুপ্তিকা পার্বণে, যেখানে তিনি কালরাত্রি হিসেবে অভিহিতা, যিনি পাণ্ডব সৈন্যদের স্বপ্নে দৃশ্যমান এবং পরে দ্রোণাচার্য পুত্র অশ্বত্থামা যখন তাদের আক্রমণ করলেন তখন তিনি প্রকৃত স্বরূপে আবির্ভূতা। মহাদেবী’র একটি শক্তি হিসেবে তিনি ষষ্ঠ শতাব্দীর ‘দেবী মাহাত্ম্যম’এ প্রসিদ্ধ, এবং ‘রক্তবীজ’ নামক অসুরকে পরাভূতকারী দেবী হিসেবে গুরুত্ব সহকারে উল্লেখিত। রক্তবীজকে নিশ্চিহ্ন করতে দেবী নরসিংহী, বৈষ্ণবী, কুমারী, মহেশ্বরী, ব্রাহ্মী, বরাহী, ঐন্দ্রী, চামু- বা কালী এই অষ্ট-মাতৃকা রূপে সংস্থিতা। দশম শতাব্দীর ‘কালিকা পুরাণে’ পরম সত্য হিসেবে কালীকে স্তুতি করা হয়। তবে ভিন্ন ও স্বতন্ত্র এক দেবী হিসেবে ষষ্ঠ শতাব্দীতে কালী প্রথম উল্লেখিত। এবং এ সকল তন্ত্রে গ্রন্থে তিনি বহির্বৃত্তে বা প্রান্তিক সীমায় বা যুদ্ধ ক্ষেত্রে স্থিতা বা দণ্ডায়মানা দেবী। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি শিবের শক্তিরূপে চিহ্নিতা, এবং বিবিধ পুরাণে শিবের উপস্থিতির সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্তা। কালিকা পুরাণে তাঁকে বলা হচ্ছে ‘আদি শক্তি’, তিনি প্রকৃতির সীমার বাইরেও অধিষ্ঠাত্রী ‘পরা প্রকৃতি’।
১৬৯৯ শকাব্দে(১৭৭৭ খ্রীষ্টাব্দে) কাশীনাথ বিরচিত ‘শ্যামাসপর্যায়বিধি’তে এ পূজার সর্বপ্রথম উল্লেখ লক্ষনীয়। পূজার প্রমাণস্বরূপ এ গ্রন্থে পুরাণ ও তন্ত্রের বচন উল্লেখিত। সপ্তদশ শতাব্দীতে বলরাম বিরচিত কালিকা মঙ্গলকাব্যে একটি বাৎসরিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান কালীকে নিবেদিত মর্মে উল্লেখিত। অষ্টাদশ শতাব্দীতে নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র বাংলায় প্রথম কালীপূজার প্রবর্তন করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে কালীপূজা বাংলায় বিশেষ প্রাধান্য লাভ করে। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পৌত্র ঈশানচন্দ্র এবং কোলকাতার সমাজের বিত্তবান ও উচ্চশ্রেণীর লোকজনের মধ্যে এ পূজার প্রচলন বৃদ্ধি পায়। ক্রমে দুর্গা পূজার সাথে সাথে কালী পূজাও বিশেষত বাংলায় একটি প্রধান হিন্দু ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হয়।
শিবের উপর দণ্ডায়মানা কেন তার তিনটি ব্যাখ্যা বর্তমান এর একটি প্রচলিত কাহিনী, একটি পৌরাণিক, অন্যটি তান্ত্রিক ব্যাখ্যা। এটা বলা হয়ে থাকে যে শক্তি ছাড়া শিব হচ্ছে শব। শিবের উপর দন্ডায়মানা কালী এটাই বুঝায় যে শক্তি বাদ দিলে বস্তু মৃতমাত্র। পৌরাণিক ব্যাখ্যা মতে, পার্বতী একদিন স্বামীকে প্রশ্ন করলেন তার দশটি রূপের মধ্যে কোনটি শিবের পছন্দ ? বিস্মিত পার্বতী শুনলেন, কালীর ভয়াল মূর্ত্তিতেই শিবের সাচ্ছন্দ্য। এই ধারণাটি দেবী ভাগবত পুরাণে ব্যাখাত। দ্বাদশ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর ভক্তিমূলক শ্যামাসঙ্গীতেও মায়ের বর্তমান রূপের এই ধারণাটি গুরুত্ব পেয়েছে। তান্ত্রিক পদ্ধতিতে তাঁর ভয়াল রূপ সত্ত্বেও রাত দুপুরে শ্মশানে তাঁর মুখোমুখি হওয়ার সাহস অর্জন এবং অন্যদিকে তাঁর প্রতি বাঙালিদের শিশুর মতো শর্তহীন ভালবাসা উভয় ক্ষেত্রে মৃত্যুর সঙ্গে পরিচিত হওয়া ও তাকে মেনে নেওয়াই মুখ্য কাজ।
দুর্গার মতো কালীও সাধারণ সর্বজনীন হিসেবে বিবেচিত। সবচেয়ে সরাসরি বহুল ভাবে তিনি পূজিতা হন মহাকালী বা ভদ্রকালী রূপে। আদি পরাপ্রকৃতি (দেবী দুর্গা) অথবা ভাগ্যবতীর দশমহাবিদ্যা রূপের একটি রূপে কালী পূজিতা হন। দেবী বন্দনার এই স্তোত্রকে বলা হয় দেবী অর্গলা স্তোত্রম্ যা নি-রূপ ‘ওঁ সর্বমঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সর্বাত্ব সাধিকে স্মরণ্যে স্ত্রম্বকে গৌরী নারায়ণী নমোহস্তুতে । ওঁ জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্রকালী কপালিনী দুর্গা ক্ষমা শিবা ধাত্রী স্বাহা সদা নমোহস্তুতে।’
মধ্যযুগের শেষের দিকে বাঙালীর ভক্তিমূলক সাহিত্যে কালী ব্যাপক স্থান নিয়ে বিরাজমান। সাধক রামপ্রসাদ সেন(১৭১৮-১৭৭৫) এর মতো কালীভক্ত উপাসকরা কালীকে নিয়ে রচনা করেছেন অসংখ্য ভক্তিমূলক গান। অথচ শিবপত্নী হিসেবে পার্বতীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে নানা কাহিনীতে উচ্চারিত হওয়া ছাড়া কালীকে অষ্টাদশ শতাব্দীর আগে বাঙালীর ঘরে ঘরে আবাহনী গেয়ে পূজিত হতে কদাচিৎ দেখা গেছে। আর বাঙালির ঘরে তাঁর ভয়াল রূপের বর্ণনা, বৈশিষ্ট, অভ্যাসসমূহ উল্লেখযোগ্য কোন রূপান্তর ঘটেনি। বাংলাদেশে অনেক কালী মন্দির আছে। এর অনেকগুলোই সুপ্রাচীন। অধুনা লুপ্ত ঢাকার রমনা কালী মন্দির তেমনি একটি পুরাতন কালী মন্দির। ব্রহ্মযামলে উল্লেখ আছে ‘কালিকা বঙ্গদেশে চ’, অর্থাৎ, ‘বঙ্গদেশে দেবী কালিকা বা কালী নামে পূজিতা হন।’ নানা রূপে নানা স্থানে কালী পূজিতা হন, যেমন দক্ষিণাকালী, শ্মশানকালী, ভদ্রকালী, রক্ষাকালী গুহ্যকালী, মহাকালী, চামুণ্ডা ইত্যাদি নামে মাহাত্ম্যে এ কালীর মধ্যে কিছু কিছু ভিন্নতা বর্তমান। অন্যদিকে বিভিন্ন মন্দিরে দশমহাবিদ্যা ব্রহ্মময়ী, ভবতারিণী, আনন্দময়ী, করুণাময়ী ইত্যাদি নামে কালী’র পূজা হয়। চট্টগ্রাম শহরের চট্টেশ্বরী শ্রী কালীবাড়ী, গোলপাহাড় শ্মশান কালীবাড়ী, দেওয়ানহাটের দেওয়ানেশ্বরী কালীবাড়ী,সদরঘাট কালীবাড়ী, পটিয়া পিঙ্গলা কালীবাড়ী, ধলঘাট বুড়াকালীবাড়ী সহ চট্টগ্রামে অনেক প্রসিদ্ধ কালী মন্দির বর্তমান। এর প্রায় প্রত্যেকটিতে প্রত্যেক শনি ও মঙ্গলবার এবং অমাবস্যায় কালীপূজা হয়। আশ্বিন মাসের অমাবস্যা তিথিতে দীপান্বিতা’র দিন কালীপূজা বিশেষভাবে পালিত হয়।
সর্বজনীন মণ্ডপে যেখানে দুর্গাপূজা হয় সেখানে অধিকাংশ মণ্ডপে কালীপূজাও হয়ে থাকে। অনেক কালীসাধক বিখ্যাত এবং শ্রদ্ধার্হ। শ্রীরামকৃষ্ণ কালীর উপাসক ছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দও কালীর ভক্ত ছিলেন। কালী প্রশস্তিমূলক গান তথা শ্যামাসঙ্গীত বাংলা গানের একটি ভিন্ন ধারা। কালীসাধক রাম প্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য এ ধারায় অন্যতম অবদান রাখেন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এবং কাজী নজরুল ইসলামও এ ধারার উৎকৃষ্ট মানের গান রেখে গেছেন। নিরক্ষর শ্রীরামকৃষ্ণ দেবী কালী সচেতনতায় সিক্ত হয়ে অনবদ্য বাণী উচ্চারণ করতেন যা শ্রীশ রচিত অমর গ্রন্থ ‘রামকৃষ্ণ কথামৃত’তে স্থান পেয়েছে। ‘মৃত্যুরূপা কালী’ দেবী কালীকে নিয়ে আছে স্বামী বিবেকানন্দ রচিত একটি বিখ্যাত সুদীর্ঘ কবিতা। ভগিনী নিবেদিতা মাতৃরূপা কালী নামক একটি কালী বিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।
দীপাবলী বা দীপান্বিতা বা বা আশ্বিনী অমাবস্যায় অনুষ্ঠিত কালীপূজা উপলক্ষে দেবী মূর্তির দক্ষিণা কালীর অবয়বে তৈরী হয়, এক্ষেত্রে দেবীবৈশিষ্ঠ্য হচ্ছে দেবী করালবদনা, কৃষ্ণবর্ণা, নীলবর্ণা বা মহামেঘবর্ণা। দেবী আলুলায়িত কেশা। রামপ্রসাদী গানে ভক্তিভরে মাকে বলা হচ্ছে,‘…এলোকেশী সর্বনাশী..’,মা এলোকেশী, রক্তচক্ষু, লোল জিহ্বা, চতুর্ভূজা, নৃমু-মালিনী,, নরহস্তের কোমরবন্ধ, বাম করযুগলে উন্মুক্ত খড়গ এবং নরমু-, ডান করদ্বয়ে বর ও অভয়মুদ্রা। দক্ষিণা কালী’র দক্ষিণ পা শিবদেহে স্পর্শমান, বাম পা খানিকটা দূরত্বে। স্বামীর গায়ে পা পড়ায় অসুর-রক্ত পানে সিক্ত জিহ্বায় কামড়। ত্রিনয়নী মা অসুর হত্যার মহাঘোরে হাস্যরতা ও ভয়াল দর্শন। মায়ের গলায় নৃমুণ্ড মালায় সাধারণত ১০৮টি অথবা ৫১ টি নরমুণ্ড বর্তমান। ১০৮ হিন্দুদের জন্য একটি পবিত্র সংখ্যা, মন্ত্রপাঠের সময় গুণার জন্য জপমালায় ১০৮টি গুটিকা থাকে। দেবনাগরী বর্ণমালায় সর্বসমেত ৫১টি বর্ণ আছে। হিন্দুদের বিশ্বাস সংস্কৃত একটি চলমান জীবন্ত ভাষা এবং এর ৫১ টি বর্ণমালায় অপার শক্তি নিহিত আছে।
মায়ের কোন চিরস্থায়ী গুণ বা প্রকৃতি নেই, যার মানে দাঁড়ায় বিশ্ব-প্রকৃতি ধ্বংসের পরেও তিনি বর্তমান

Thursday, December 6, 2018


হরিহর

হরিহর হল হিন্দু দেবতা বিষ্ণু (হরি) ও শিবের (হর) একটি মিশ্র রূপ। এই রূপটি শঙ্করনারায়ণ ("শঙ্কর" মানে শিব, এবং "নারায়ণ" নামে বিষ্ণু) নামেও পরিচিত। বৈষ্ণব ও শৈব ধর্মাবলম্বীরা এই রূপটিকে সর্বোচ্চ ঈশ্বরের একটি রূপ হিসেবে পূজা করেন। একই পরমেশ্বরের দুটি ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সহাবস্থান বোঝাতেও হিন্দু দর্শনে "হরিহর" কথাটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। উল্লেখ্য, বিষ্ণু ও শিবের স্বরূপ (বৈদিক ও পৌরাণিক ধর্মশাস্ত্রের বর্ণনা অনুসারে) এবং তাদের ভিন্ন বা অভিন্ন অবস্থা হিন্দু দর্শনের বিভিন্ন শাখায় একটি বিতর্কের বিষয়।

বৈশিষ্ট্য
হিন্দুধর্মের বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি বিষ্ণু ও শিবকে ঘিরে একাধিক কিংবদন্তি ও প্রথার জন্ম দিয়েছে। কোনো কোনো সম্প্রদায়ের মতে শুধু বিষ্ণুই (ও তাঁর অবতারসমূহ) সর্বোচ্চ ঈশ্বর। আবার কোনো কোনো সম্প্রদায় শিবকে (তাঁর বিভিন্ন রূপভেদ সহ) সর্বোচ্চ ঈশ্বর মনে করে। কোনো কোনো সম্প্রদায়ের মতে শিব ও বিষ্ণু একই ঈশ্বরের দুটি ভিন্ন রূপ এবং উভয়েই পরমেশ্বর। আবার কোনো কোনো সম্প্রদায় পরমেশ্বরকে নিরাকার (অদ্বৈত) মনে করে। তাঁরা বিষ্ণু ও শিবকে নিরাকার ব্রহ্মের দুটি ভিন্ন রূপ মনে করেন।
বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ ও সেগুলির অনুবাদ উদ্ধৃত করে প্রত্যেক মতের স্বপক্ষেই প্রমাণ দেওয়া যায়। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই একটি রূপকে অপর রূপের ঊর্ধ্বে রাখা হয়। তবে আজও শৈবরা শিবকে এবং বৈষ্ণবরা বিষ্ণুকে অন্যান্য দেবতাদের উপরে স্থান দেন।

অভিন্নতা
শিবানন্দের মতে: "শিব ও বিষ্ণু এক ও অভিন্ন। তাঁরা স্বরূপত এক ও অভিন্ন। সর্বব্যাপী পরমাত্মা বা পরম সত্যের বিভিন্ন রূপের এই দুটি ভিন্ন নাম। ‘শিবস্য হৃদয়ং বিষ্ণুর্বিষ্ণোশ্চ হৃদয়ং শিবঃ’—শিব বিষ্ণুর হৃদয় ও একই ভাবে বিষ্ণু শিবের হৃদয়।"
স্বামীনারায়ণ মতেও বিষ্ণু ও শিব একই ঈশ্বরের দুটি ভিন্ন রূপ মাত্র।উল্লেখ্য, স্বামীনারায়ণ মতবাদ বৈষ্ণবদের মধ্যে সংখ্যালঘু হলেও সমসাময়িক স্মার্ত মতানুসারী হিন্দুধর্মে বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি মত।

শিল্পকলা
হরিহরের মূর্তিটির অর্ধেক অংশ শিবের মতো, অর্ধেক অংশ বিষ্ণুর মতো। শিব অর্ধের মাথায় জটা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাঘছাল পরা। এই অর্ধের গায়ের রং সাদাটে, কোথাও কোথাও ছাইমাখা। বিষ্ণু অর্ধটি মুকুট ও অন্যান্য অলংকার পরিহিত। এটির গায়ের রং কালো। শিব অংশটি যোগীদের মতো। বিষ্ণু অংশটি রাজসিক। তাই এই মূর্তিটিকে যোগী ও গৃহস্থের উভয়ের পূজার উপযোগী মনে করা হয়। যদিও অন্যমতে শিবকে গৃহস্থেরও আদর্শ মনে করা হয়। এবং সেই কারণেই তাঁকে বিষ্ণুর সঙ্গে একীকৃত করা হয়েছে বলে মনে করা হয়।

Wednesday, December 5, 2018


বিপদতারিনী

 যিঁনি সমগ্র বিপদ থেকে রক্ষা করেন বা যিঁনি বিপদ সমূহ নাশ করেন তিনিই বিপদতারিনী । যিঁনি দুর্গা তিনিই বিপদতারিনী । তিঁনি পুরাণে কৌষিকীদেবী নামে খ্যাতা । আবার তিনিই জয়দুর্গা । দেবীর উৎপত্তি হয়েছিলো ভগবান শিবের অর্ধাঙ্গিনী দেবী পার্বতীর কোষিকা থেকে- তাই তিনি কৌষিকী । পুরাণ মতে শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামক দুই অসুরের হাতে দেবতারা পরাজিত হয়ে হিমালয়ে গিয়ে মহামায়ার স্তব করতে লাগলেন । সেই সময় ভগবতী পার্বতী সেই স্থান দিয়ে যাচ্ছিল্লেন। দেবী তাদের স্তব শুনে বললেন – “ আপনারা এখানে কার স্তব করিতেছেন ? ”
সেই সময় ভগবতী পার্বতীর শরীর থেকে তার মতন দেখতে আর এক জন দেবী বের হয়ে আসলেন । সেই নব আবির্ভূতা দেবী জানালেন – “ ইহারা আমারাই স্তব করিতেছেন ।”
এই দেবী যুদ্ধে শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামক অসুরের বধ করেছিলেন । এই দেবী মোহাচ্ছন্ন শুম্ভাসুরকে অদ্বৈত জ্ঞান দান করে বলেছিলেন-

“ ঐকেবাহং জগত্যত্র দ্বিতীয়া কা মমাপরা ।
পশ্যৈতা দুষ্ট ময্যেব বিশন্তো মদবিভূতয়ঃ ।। ”

( এই জগতে এক আমিই আছি । আমি ছাড়া আমার সাহায্যকারিনী আর কে আছে ? ওরে দুষ্ট ভাল করে দেখ , ব্রহ্মাণী প্রভৃতি শক্তি আমারই অভিন্না বিভুতি বা শক্তি । এই দেখ তারা আমার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ।”)
আর একটি পৌরাণিক গাঁথানুসারে একদা ভগবান মহাদেব রহস্যচ্ছলে দেবী পার্বতীকে ‘কালী’ বলে উপহাস করেন। এতে দেবী ক্রুদ্ধ হয়ে তপস্যার মাধ্যমে নিজের “কৃষ্ণবর্ণা” রূপ পরিত্যাগ করলেন । সেই কৃষ্ণবর্ণা স্বরূপ দেবীই হলেন , দেবীর পার্বতীর অঙ্গ থেকে সৃষ্টা জয়দুর্গা বা কৌষিকীদেবী, বিপদতারিনীদুর্গা । দেবীর ধ্যান মন্ত্রঃ-

ওঁ কালাভ্রাভাং কটাক্ষৈররিকুলভয়দাং মৌলীবন্ধেন্দুরেখাম্ ।
শঙ্খং চক্রং কৃপাণং ত্রিশিখমপি করৈরুদ্বহন্তীং ত্রিনেত্রাম্ ।
সিংহাস্কন্ধাধিরুঢ়াং ত্রিভুবন – মখিলং তেজসা পুরয়ন্তীম্ ।
ধ্যায়েদ্ দুর্গাং জয়াখ্যাং ত্রিদশপরিবৃতাং সেবিতাং সিদ্ধিকামৈঃ ।।

এর অর্থ- কালাভ্র আভাং ( এর অর্থ দুই প্রকার হয়, একটি স্বর্ণ বর্ণা অপরটি কালো মেঘের ন্যায় ) , কটাক্ষে শত্রুকূলত্রাসিণী , কপালে চন্দ্রকলা শোভিতা, চারি হস্তে শঙ্খ, চক্র, খড়্গ ও ত্রিশূল ধারিণী, ত্রিনয়না, সিংহোপরি সংস্থিতা , সমগ্র ত্রিভুবন স্বীয় তেজে পূর্ণকারিণী , দেবগণ- পরিবৃতা , সিদ্ধসঙ্ঘ সেবিতা জয়াখ্যা দুর্গার ধ্যন করি ।
এই জয়দুর্গা বা কৌষিকীদেবী, বিপদতারিনীদুর্গা । পঞ্চদেবতার একজন । দেবীর অনেক রূপ দেখা যায়। উত্তর ভারতে অষ্টাদশ রূপের ধ্যান ও পূজা হয়, কোথাও দশভুজা রূপে পূজা হয়, কোথাও আবার চতুর্ভুজা স্বর্ণ বর্ণা আবার কোথাও কৃষ্ণ বর্ণা রূপে পূজিতা হয় । জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসে মঙ্গল ও শণিবারে মায়ের পূজো হয় । যেখানে ১৩ প্রকার ফল, পুস্প, মিষ্টি, পান সুপারী অর্পণ করা হয়। আসুন মায়ের চরণে প্রনাম জানাই। মা যেনো সকলের সর্ব প্রকার বিপদনাশ করেন ।

Monday, December 3, 2018


দশাবতার বিষ্ণু

দশাবতার বিষ্ণু দশ প্রধান অবতার। বৈষ্ণব দর্শনে, কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে মর্ত্যে অবতীর্ণ পরম সত্ত্বাকে অবতার নামে অভিহিত করা হয়। বিষ্ণুর (বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে কৃষ্ণের) দশ মুখ্য অবতারের সমষ্টিগত নামই দশাবতার। এই দশাবতারের কথা জানা যায় গরুড় পুরাণ
 (১।৮৬।১০-১১) থেকে। এই দশ অবতার মানব সমাজে তাঁদের প্রভাব-প্রতিপত্তির ভিত্তিতে সর্বাপেক্ষা অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হন।
দশাবতারের অধিকাংশই অভিহিত হন লীলা-অবতার নামে। হিন্দু বিশ্বাস অনুসারে, প্রথম চার অবতারের আবির্ভাবকাল সত্যযুগ। পরবর্তী তিন অবতার ত্রেতাযুগে অবতীর্ণ হন। অষ্টম ও নবম অবতারের আবির্ভাবকাল যথাক্রমে দ্বাপরযুগ ও কলিযুগ। দশম অবতার কল্কির আবির্ভাব ৪২৭,০০০ বছর পর কলিযুগের অন্তিম পর্বে ঘটবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। বিষ্ণু পুরাণ–এও বলা হয়েছে, কল্কি অবতারের আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই কলিযুগের সমাপ্তি ঘটবে। কল্কি দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করে এক নতুন সত্যযুগের সূচনা ঘটাবেন।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ:-
অনুমিত হয়, ভাগবতধর্মের অধীনে বুদ্ধকে বিষ্ণুর অবতাররূপে গ্রহণ গুপ্তযুগে (৩৩০-৫৫০ খ্রিস্টাব্দ) দুই ধর্মের সম্পর্কের নৈকট্যের ফলস্রুতি। এই কারণে মহাযান বৌদ্ধধর্মকে অনেক সময় বুদ্ধ-ভাগবতধর্ম বলা হয়ে থাকে। উল্লেখ্য, গবেষকরা মনে করেন যে এই যুগেই হিন্দুধর্মে অবতারতত্ত্ব পূর্ণ বিকাশ লাভ করে।
ঐতিহাসিক বিষ্ণুধর্মের বিবর্তনের ফলে বর্তমানকালের জটিল বৈষ্ণবধর্মের উদ্ভব। বিষ্ণু, নারায়ণ, বাসুদেব ও কৃষ্ণের আরাধনাকেন্দ্রিক এই ধর্মবিশ্বাস প্রতিষ্ঠালাভ করে ভগবদ্গীতার যুগে (খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী-খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দী)।
দ্বাদশ অলবর নামে পরিচিত সন্তেরা তাঁদের আধ্যাত্মিক সঙ্গীতের মাধ্যমে এই সম্প্রদায়কে সাধারণ মানুষের মধ্যে পৌঁছিয়ে দিয়েছিলেন। পূর্বকালের অলবরগণ বিষ্ণুর অবতারদের পৃথকভাবে তালিকাভুক্ত করেননি। এমনকি তাঁরা কৃষ্ণকেও অবতাররূপে পৃথক করেননি। তামিল ভাষায় তাঁদের বিষ্ণু ও কৃষ্ণ স্তুতিগান নালয়িরা (দিব্য প্রবন্ধ) নামে পরিচিত।
তালিকা

১. মৎস্য
মাছরূপে সত্যযুগে অবতীর্ণ
২. কূর্ম
কচ্ছপের রূপে সত্যযুগে অবতীর্ণ
৩. বরাহ
বন্য শূকরের রূপে সত্যযুগে অবতীর্ণ
৪. নৃসিংহ
অর্ধনরসিংহরূপে সত্যযুগে অবতীর্ণ
৫. বামন
খর্বকায় বামনের রূপে ত্রেতাযুগে অবতীর্ণ
৬. পরশুরাম
পরশু অর্থাৎ কুঠারধারী রামের রূপে ত্রেতাযুগে অবতীর্ণ
৭. রাম
অযোধ্যার যুবরাজ ও রাজা রূপে ত্রেতাযুগে অবতীর্ণ
৮. কৃষ্ণ
দ্বাপরযুগে জ্যেষ্ঠভ্রাতা বলরাম সহ অবতীর্ণ। ভাগবত পুরাণ অনুসারে দ্বাপরযুগে অনন্ত নাগের অবতার বলরাম রূপে কৃষ্ণের সঙ্গে অবতীর্ণ হন। অধিকাংশ বৈষ্ণব শাখাসম্প্রদায় বলরামকে বিষ্ণুর অবতার বলে মনে করেন। যে সকল সূত্রে বুদ্ধের কোনো উল্লেখ নেই সেখানে বলরামকেই বিষ্ণুর নবম অবতার রূপে দশাবতারের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
৯. বলরাম
কোনো কোনো মতে বিষ্ণুর নবম অবতার।
১০. কল্কি
এই ভবিষ্যৎ অবতার কলিযুগের শেষ পর্বে অবতীর্ণ হবেন বলে হিন্দুরা মনে করেন।
জয়দেবের দশাবতার স্তোত্র
জয়দেব রচিত প্রলয়পয়োধিজলে (গীতগোবিন্দম্ কাব্যের প্রথম সর্গের প্রথম গীত, দশাবতার স্তোত্র নামে সমধিক পরিচিত) স্তোত্রে দশটি পৃথক স্তবকে দশ অবতারের বিবরণদানের পর নিম্নোক্ত শ্লোকে দশাবতারের কীর্তির একটি সুসংবদ্ধ তালিকা প্রদান করা হয়েছে:
বেদানুদ্ধরতে জগন্তি বহতে ভূগোলমুদ্বিভ্রতে
দৈত্যং দারয়তে বলিং ছলয়তে ক্ষত্রক্ষয়ং কুর্বতে।
পৌলস্ত্যং জয়তে হলং কলয়তে কারুণ্যমাতন্বতে
ম্লেচ্ছান মূর্চ্ছয়তে দশাকৃতিকৃতে কৃষ্ণায় তুভ্যং নমঃ।।
বেদের উদ্ধারকারী, ত্রিলোকের ভারবহনকারী, ভূমণ্ডল উত্তোলনকারী, হিরণ্যকশিপু বিদারণকারী, বলিকে ছলনাকারী, ক্ষত্রক্ষয়কারী, দশানন-সংহারকারী, হলকর্ষণকারী, করুণাবিতরণকারী, ম্লেচ্ছধ্বংসকারী, দশরূপধারী হে কৃষ্ণ, তোমায় প্রণাম করি।।

অবতারের বৈজ্ঞানিক বিবর্তন:-
মৎস - পৃথিবীর তিনভাগ জল আর একভাগ স্থলে প্রথমে জলচর প্রাণীর আবির্ভাব ঘটে। কুর্ম - উভচর প্রাণী। জল ও স্থল, দুই জায়গাতেই প্রাণীর বসবাস শুরু হয়। বরাহ - কেবল স্থলে বসবাস করতে শেখে অনেক জীব। নৃসিংহ - মানব জাতির পূর্বতন পশুসুলভ অবস্থা, যখন মানুষ পূর্ণতা পায়নি। বামন - মানুষে ক্ষুদ্র বিকাশ। পরশুরাম - মানুষের আদিম পর্যায়। প্রকৃতির কোলে জীবের বাস। মানুষের জীবনযাপন জঙ্গলে। সেখান থেকেই বিবর্তনের শুরু। রাম - সমাজ বিকাশে প্রথম উন্নত পর্যায়। সমাজ, গোষ্ঠী, মানুষ-এই কৃষ্টিতে উৎকর্ষতা লাভ করে। কৃষ্ণ - নিয়ে এলেন রাজনীতি। মানুষের বিবর্তন, সমাজের ধারাবাহিক পরিবর্তন এবং টিকে থাকার লড়াইয়ে মানুষের কূটনীতিক আচরণের এই প্রথম বৈজ্ঞানিক আবির্ভাব। বুদ্ধ - জ্ঞান ছাড়া পৃথিবী বর্ণহীন, অন্ধকার। কুসংস্কার দূর করে জ্ঞানদীপ্তকরণের অবতার গৌতম বুদ্ধ। বিষ্ণুর নবম অবতার তিনি। কল্কি - আসন্ন। এখনও সমাজ শ্রীবিষ্ণুর এই অবতারের অপেক্ষায়। মানুষের মধ্যে থাকবে এমন শক্তি যা হবে ধ্বংস ও সৃষ্টির ধারক ও বাহক।


কামাখ্যা মন্দির

কামাখ্যা মন্দির হল ভারতের আসাম রাজ্যের গুয়াহাটি শহরের পশ্চিমাংশে নীলাচল পর্বতে অবস্থিত হিন্দু দেবী কামাখ্যার একটি মন্দির। এটি ৫১ সতীপীঠের অন্যতম। এই মন্দির চত্বরে দশমহাবিদ্যার মন্দিরও আছে। এই মন্দিরগুলিতে দশমহাবিদ্যা অর্থাৎ ভুবনেশ্বরী, বগলামুখী, ছিন্নমস্তা, ত্রিপুরাসুন্দরী, তারা, কালী, ভৈরবী, ধূমাবতী, মাতঙ্গী ও কমলা – এই দশ দেবীর মন্দিরও রয়েছে। এর মধ্যে ত্রিপুরাসুন্দরী, মাতঙ্গী ও কমলা প্রধান মন্দিরে পূজিত হন। অন্যান্য দেবীদের জন্য পৃথক মন্দির আছে। হিন্দুদের, বিশেষত তন্ত্রসাধকদের কাছে এই মন্দির একটি পবিত্র তীর্থ।

বর্ণনা:-
কামাখ্যা মন্দিরে চারটি কক্ষ আছে: গর্ভগৃহ ও তিনটি মণ্ডপ (যেগুলির স্থানীয় নাম চলন্ত, পঞ্চরত্ন ও নাটমন্দির)। গর্ভগৃহটি পঞ্চরথ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত।  অন্যগুলির স্থাপত্য তেজপুরের সূর্যমন্দিরের সমতুল্য। এগুলিতে খাজুরাহো বা অন্যান্য মধ্যভারতীয় মন্দিরের আদলে নির্মিত খোদাইচিত্র দেখা যায়। মন্দিরের চূড়াগুলি মৌচাকের মতো দেখতে। নিম্ন আসামের বহু মন্দিরে এই ধরনের চূড়া দেখা যায়। গর্ভগৃহটি আসলে ভূগর্ভস্থ একটি গুহা। এখানে কোনো মূর্তি নেই। শুধু একটি পাথরের সরু গর্ত দেখা যায়।
গর্ভগৃহটি ছোটো ওঅন্ধকারাচ্ছন্ন। সরু খাড়াই সিঁড়ি পেরিয়ে এখানে পৌঁছাতে হয়। ভিতরে ঢালু পাথরের একটি খণ্ড আছে যেটি যোনির আকৃতিবিশিষ্ট। এটিততে প্রায় দশ ইঞ্চি গভীর একটি গর্ত দেখা যায়। একটি ভূগর্ভস্থ প্রস্রবনের জল বেরিয়ে এই গর্তটি সবসময় ভর্তি রাখে। এই গর্তটিই দেবী কামাখ্যা নামে পূজিত এবং দেবীর পীঠ হিসেবে প্রসিদ্ধ।
কামাখ্যা মন্দির চত্বরের অন্যান্য মন্দিরগুলিতেই একই রকম যোনি-আকৃতিবিশিষ্ট পাথর দেখা যায়, যা ভূগর্ভস্থ প্রস্রবনের জল দ্বারা পূর্ণ থাকে।

কামাখ্যা মন্দিরের অধিষ্ঠান, এটির থেকে অনূমিত হয় মূল মন্দিরটি নাগারা স্থাপত্যশৈলীর মন্দির ছিল।
মধ্য আসামে এই ধরনের শিখর বা চূড়া অনেক মন্দিরেই দেখা যায়। এর চারপাশে বঙ্গীয় চারচালা স্থাপ্তত্যে অঙ্গশিখর থাকে। অন্তরাল নামে এক ধরনের স্থাপত্য দেখা যায়, যা আটচালা স্থাপত্যের অনুরূপ।
বর্তমান মন্দির ভবনটি অহোম রাজাদের রাজত্বকালে নির্মিত। এর মধ্যে প্রাচীন কোচ স্থাপত্যটি সযত্নে রক্ষিত হয়েছে। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মাঝামাঝি সময় মন্দিরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে ১৫৬৫ সাল নাগাদ কোচ রাজা চিলরায় মধ্যযুগীয় মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী অনুসারে মন্দিরটি পুনরায় নির্মাণ করে দেন। এখন যে মৌচাক-আকারের চূড়াটি দেখা যায়, তা নিম্ন আসামের মন্দির স্থাপত্যের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মন্দিরের বাইরে গণেশ ও অন্যান্য হিন্দু দেবদেবীদের মূর্তি খোদিত আছে।[১৪] মন্দিরের তিনটি প্রধান কক্ষ। পশ্চিমের কক্ষটি বৃহৎ ও আয়তাকার। সাধারণ তীর্থযাত্রীরা এটি পূজার জন্য ব্যবহার করেন না। মাঝের কক্ষটি বর্গাকার। এখানে দেবীর একটি ছোটো মূর্তি আছে। এই মূর্তিটি পরবর্তীকালে এখানে স্থাপিত হয়। এই কক্ষের দেওয়ালে নরনারায়ণ, অন্যান্য দেবদেবী ও তৎসম্পর্কিত শিলালেখ খোদিত আছে। মাঝের কক্ষটিই মূল গর্ভগৃহে নিয়ে যায়। এটি গুহার আকৃতিবিশিষ্ট। এখানে কোনো মূর্তি নেই। শুধু যোনি-আকৃতিবিশিষ্ট পাথর ও ভূগর্ভস্থ প্রস্রবনটি আছে। প্রতিবছর গ্রীষ্মকালে অম্বুবাচী মেলার সময় কামাখ্যা দেবীর ঋতুমতী হওয়ার ঘটনাকে উদযাপন করা হয়। এই সময় মূল গর্ভগৃহের প্রস্রবনের জল আয়রন অক্সাইডের প্রভাবে লাল হয়ে থাকে। ফলে এটিকে ঋতুস্রাবের মতো দেখতে হয়।

ইতিহাস
প্রাচীন কামরূপ রাজ্যের বর্মণ রাজবংশের শাসনকালে (৩৫০-৬৫০ খ্রিস্টাব্দ) এবং সপ্তম শতাব্দীর চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং-এর রচনাতেও কামাখ্যা উপেক্ষিত হয়েছে। সেই সময় কামাখ্যাকে অব্রাহ্মণ কিরাত জাতীয় উপাস্য দেবী মনে করা হত।[ নবম শতাব্দীতে ম্লেচ্ছ রাজবংশের বানমলবর্মদেবের তেজপুর লিপিতে প্রথম কামাখ্যার শিলালিপি-উল্লেখ পাওয়া যায়। এই শিলালিপি থেকে প্রমাণিত হয় খ্রিস্টীয় অষ্টম-নবম শতাব্দীতে এখানে একটি বিশাল মন্দির ছিল। জনশ্রুতি অনুসারে, সুলেমান কিরানির (১৫৬৬-১৫৭২) সেনাপতি কালাপাহাড় এই মন্দির ধ্বংস করেছিলেন। তবে ঐতিহাসিক প্রমাণ থেকে জানা যায় যে, আলাউদ্দিন হুসেন শাহ কামতা রাজ্য ক্রামণ করার সময় (১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দ) এই মন্দির ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। কথিত আছে, কোচ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বসিংহ এই ধ্বংসাবশেষ খুজে পান। তিনিই এই মন্দিরে পূজার পুনর্প্রবর্তন করেন। তবে তাঁর পুত্র নরনারায়ণের রাজত্বকালে ১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দে এই মন্দিরটি নির্মাণের কাজ শেষ হয়। পুনর্নির্মাণের সময় পুরনো মন্দিরের উপাদান ব্যবহৃত হয়েছিল। পরে অহোম রাজ্যের রাজারা এই মন্দিরটি আরও বড়ো করে তোলেন। অন্যান্য মন্দিরগুলি পরে নির্মিত হয়।
কামাক্ষ্যা

অহোম রাজত্বে কামাখ্যা
জনশ্রুতি অনুসারে, কোচবিহার রাজপরিবারকে দেবী কামাখ্যাই পূজার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। কোচবিহার রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতা ভিন্ন এই মন্দির পরিচালনা কষ্টকর হয়ে ওঠে। ১৬৫৮ সালে অহোম রাজা জয়ধ্বজ সিংহ নিম্ন আসাম জয় করলে এই মন্দির সম্পর্কে তাঁদের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। অহোম রাজারা শাক্ত বা শৈব ধর্মাবলম্বী হতেন। তাঁরাই এই মন্দির সংস্কার ও পৃষ্ঠপোষকতার দায়িত্ব নিতেন।
রুদ্র সিংহ (রাজত্বকাল (১৬৯৬-১৭১৪) বৃদ্ধবয়সে গুরুর নিকট দীক্ষাগ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু প্রজা ব্রাহ্মণের কাছে মাথা নত করতে পারবেন না বলে তিনি পশ্চিমবঙ্গে দূত পাঠালেন। নদিয়া জেলার শান্তিপুরের কাছে মালিপোতার বিশিষ্ট শাক্ত পণ্ডিত কৃষ্ণরাম ভট্টাচার্যকে তিনি আসামে আসার অনুরোধ জানালেন। কৃষ্ণরাম জানালেন, কামাখ্যা মন্দিরের দায়িত্ব দিলে, তবেই তিনি আসাম যাবেন। রাজা নিজে দীক্ষা না নিলেও, তাঁর পুত্রদের ও অন্যান্য ব্রাহ্মণদের কৃষ্ণরামের কাছে দীক্ষা নিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
রুদ্র সিংহের মৃত্যুর পর তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র শিব সিংহ (রাজত্বকাল ১৭১৪-১৭৪৪) রাজা হন। তিনি কামাখ্যা মন্দির ও পার্শ্ববর্তী বিরাট একটি ভূখণ্ড কৃষ্ণরামকে দেবত্তোর সম্পত্তি হিসেবে দান করেন। তাঁকে ও তাঁর বংশধরদের পর্বতীয়া গোঁসাই বলা হত। কারণ তাঁরা নীলাচল পর্বতের উপর থাকতেন। কামাখ্যা মন্দিরের অনেক পুরোহিত ও আসামের অনেক আধুনিক শাক্ত এই পর্বতীয়া গোঁসাইদের শিষ্য।

পূজা
অনুমিত হয়, প্রাচীনকালে কামাখ্যা ছিল খাসি উপজাতির বলিদানের জায়গা। এখনও বলিদান এখানে পূজার অঙ্গ। এখানে অনেক ভক্তই দেবীর উদ্দেশ্যে ছাগলবলি দেন।
কালিকা পুরাণ অনুসারে, কামাখ্যায় পূজা করলে সকল ইচ্ছা পূর্ণ হয়। শিবের তরুণী স্ত্রী ও মোক্ষদাত্রী শক্তিই কামাখ্যা নামে পরিচিত।
১২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে নীলাচল পর্বতে মঙ্গোলরা আক্রমণ কলে প্রথম তান্ত্রিক কামাখ্যা মন্দিরটি ধ্বংস হয়েছিল। দ্বিতীয় তান্ত্রিক মন্দিরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল মুসলমান আক্রমণের সময়। আসামের অন্যান্য দেবীদের মতো, দেবী কামাখ্যার পূজাতেও আর্য ও অনার্য সংস্কৃতির মিশ্রণ দেখা যায়।দেবীকে যেসব নামে পূজা করা হয় তার মধ্যে অনেক স্থানীয় আর্য ও অনার্য দেবদেবীর নাম আছে।যোগিনী তন্ত্র অনুসারে, এই যোগিনী পীঠের ধর্মের উৎস কিরাতদের ধর্ম। বাণীকান্ত কাকতির মতে, গারো উপজাতির মানুষেরা কামাখ্যায় শূকর বলি দিত। এই প্রথা নরনারায়ণ-কর্তৃক নিযুক্ত পুরোহিতদের মধ্যেও দেখা যেত।
কামাখ্যার পূজা বামাচার ও দক্ষিণাচার উভয় মতেই হয়। সাধারণত ফুল দিয়েই পূজা দেওয়া হয়। মাঝে মাঝে পশুবলি হয়। স্ত্রীপশু বলি সাধারণত নিষিদ্ধ হলেও, বহু পশুবলির ক্ষেত্রে এই নিয়মে ছাড় দেওয়া হয়।

কিংবদন্তি
বারাণসীর বৈদিক ঋষি বাৎস্যায়ন খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে নেপালের রাজার দ্বারস্থ হয়ে উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলিকে হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত ও তাদের নরবলি প্রথার গ্রহণযোগ্য বিকল্প চালু করার জন্য অনুরোধ করেন। বাৎস্যায়নের মতে, পূর্ব হিমালয়ের গারো পাহাড়ে তারা দেবীর তান্ত্রিক পূজা প্রচলিত ছিল। সেখানে আদিবাসীরা দেবীর যোনিকে ‘কামাকি’ নামে পূজা করত। ব্রাহ্মণ্যযুগে কালিকাপুরাণে সব দেবীকেই মহাশক্তির অংশ বলা হয়েছে। সেই হিসেবে, কামাক্ষ্যাও মহাশক্তির অংশ হিসেবে পূজিত হন।
কালিকা পুরাণের মতে, কামাখ্যা মন্দিরে সতী শিবের সঙ্গে বিহার করেন। এখানে তাঁর মৃতদেহের যোনি অংশটি বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। দেবীভাগবত পুরাণের ১০৮ পীঠের তালিকায় যদিও এই তীর্থের নাম নেই। তবে অপর একটি তালিকায় কামাখ্যা নাম পাওয়া যায়।যোগিনী তন্ত্রে অবশ্য কালিকা পুরাণের মতকে অগ্রাহ্য করে কামাখ্যা কালী বলা হয়েছে এবং যোনির প্রতীকতত্ত্বের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

উৎসব
তন্ত্রসাধনার কেন্দ্র হওয়ায় বার্ষিক অম্বুবাচী মেলা অনুষ্ঠানে এখানে প্রচুর মানুষ আসেন। এছাড়া বার্ষিক মনসা পূজাও মহাসমারোহে আয়োজিত হয়, দুর্গাপূজা কামাক্ষ্যা মন্দিরের একটি অন্যতম প্রধান উৎসব।

তারা তারিণী

তারা হিন্দু দেবী কালীর একটি বিশিষ্ট রূপ। ইনি দশমহাবিদ্যার দ্বিতীয় মহাবিদ্যা। কালীর মতোই তারা ভীষণা দেবী। তারার বিভিন্ন রূপান্তর উগ্রতারা, নীল সরস্বতী, কুরুকুল্লা তারা, খদির বাহিনী তারা, মহাশ্রী তারা, বশ্যতারা, সিতাতারা, ষড়ভূজ সিতাতারা, মহামায়া বিজয়বাহিনী তারা ইত্যাদি। বৌদ্ধধর্মেও তারাদেবীর পূজা প্রচলিত। তারার মূর্তিকল্পনা কালী অপেক্ষাও প্রাচীনতর। কোনো কোনো মতে তারা দুর্গা বা চণ্ডীর রূপান্তর। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার তারাপীঠে অবস্থিত দেবী তারার মন্দির বিখ্যাত।

মূর্তিতত্ত্ব
হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য তার হিন্দুদের দেবদেবী: উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ বইয়ে বলেছেন, তন্ত্রসারে দেবী তারার যে রূপ বর্ণিত হয়েছে তা নিম্নরূপ:
তারা প্রত্যালীঢ়পদা অর্থাৎ শববক্ষে দক্ষিণপদ স্থাপিতা। ভয়ংকরী, মুণ্ডমালাভূষিতা, খর্বা, লম্বোদরী, ভীষণা, কটিতে ব্যাঘ্রচর্মাবৃতা, নবযৌবনা, পঞ্চমুদ্রা শোভিতা, চতুর্ভূজা, লোলজিহ্বা, মহাভীমা, বরদা, খড়্গ কাতরি দক্ষিণহস্তে ধৃতা, বামহস্তদ্বয়ে কপাল ও নীলপদ্ম, পিঙ্গলবর্ণ একজটাধারিণী, ললাটে অক্ষোভ্য প্রভাতসূর্যের মতো গোলাকার তিন নয়নশোভা, প্রজ্জ্বলিত চিতামধ্যে অবস্থিতা, ভীষণদন্তা, করালবদনা, নিজের আবেশে হাস্যমুখী, বিশ্বব্যাপ্ত জলের মধ্যে শ্বেতপদ্মের উপর অবস্থিতা।
তন্ত্রসারে তারার আরও একটি ধ্যানমন্ত্র বর্ণিত হয়েছে: "শ্যামবর্ণা ত্রিনয়না দ্বিভূজা, বরমুদ্রা ও পদ্মধারিণী, চতুর্দিকে বহুবর্ণা ও বহুরূপা শক্তির দ্বারা বেষ্টিতা, হাস্যমুখী মুক্তাভূষিতা, রত্নপাদুকায় পাদদ্বয় স্থাপনকারিণী তারাকে ধ্যান করবে।বৃহদ্ধর্ম পুরাণে তারাকে কেবল শ্যামবর্ণা ও কালরূপিণী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তন্ত্রসারে তারাকেই মহানীল সরস্বতী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতচন্দ্র রায় তাঁর অন্নদামঙ্গল কাব্যে তারার যে রূপবর্ণনা করেছেন, তা নিম্নরূপ:

তারা রূপ ধরি সতী হইলা সম্মুখ।।
নীলবরণা লোলজিহ্বা করালবদনা। সর্পবান্ধা ঊর্দ্ধ এক জটাবিভূষণা।।
অর্দ্ধচন্দ্র পাঁচখানি শোভিত কপাল। ত্রিনয়ন লম্বোদর পরা বাঘছাল।।
নীল পদ্ম খড়্গ কাতি সমুণ্ড খর্পর। চারি হাতে শোভে আরোহণ শিবোপর।।
তারাপীঠের ব্রহ্মশিলায় খোদিত তারামূর্তিটি দ্বিভূজা, সর্পযজ্ঞোপবীতে ভূষিতা এবং তাঁর বাম কোলে পুত্ররূপী শিব শায়িত।

Sunday, December 2, 2018


দক্ষিণাকালী
দক্ষিণা কালী হিন্দু দেবী কালীর সবচেয়ে জনপ্রিয় রূপ এবং জন্ম, স্থিতি, শক্তির দেবী ও প্রসিদ্ধ মূর্তি। তাঁকে শিবের সঙ্গী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দক্ষিণা কালীর রুপ মহাকালী ( মৃত্যু এবং সময়ের দেবী ) এবং শ্মশানকালীর ( ​​শ্মশানে পূজ্য দেবী ) থেকে কিছু ভিন্ন। তাঁকে এক মহান মাতৃকা হিসাবে ভারতে পূজা করা হয়।

নাম-ব্যুৎপত্তি
দক্ষিণা কালীর ডান পা শিবের বক্ষস্থলে। সেই কারণে কালীর এই রূপের নাম দক্ষিণাকালী। তাত্ত্বিকের তাঁর নামের যে ব্যাখ্যা দেন তা নিম্নরূপ: দক্ষিণদিকের অধিপতি যম যে কালীর ভয়ে পলায়ন করেন, তাঁর নাম দক্ষিণাকালী।

রামপ্রসাদ সেনের গুরু কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ স্বপ্নে আদেশ পান কালীর প্রসন্ন ভাবমূর্তি রচনা করার। স্বপ্নে দেবী তাঁকে জানান পরবর্তী ভোরে যে নারীকে তিনি সর্বপ্রথম দেখবেন তার রূপ অনুযায়ী কালীর এক প্রসন্ন প্রতিমূর্তি তৈরী করতে। পরবর্তী ভোরে যে নারীকে প্রথম সে দেখেন তিনি কৃষ্ণবর্ণা, তার ডান পা সামনে, উন্মুক্ত কালো কেশ এবং বাম হাত উত্তোলনের দ্বারা দেয়ালে গোবর স্থাপন করছেন। আকস্মিক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশকে সামনে দেখে সেই মহিলা খুব লজ্জা পেলেন এবং তার জিহ্বা বার করে দাঁত দিয়ে চাপলেন। সেই নারীর রূপ অনুসরণ করে আগমবাগীশ মহাশয় কালীর মূর্তিতত্ত্ব অনুযায়ী দক্ষিণা কালীর মূর্তি রচনা করেছিলেন। এর আগে কালী যন্ত্রে কালীপূজা হতো।

মূর্তিতত্ত্ব
দক্ষিণা কালীর ডান পা শিবের বুকে। তিনি কালীর অন্যান্য রূপ থেকে ভিন্ন এবং তাঁকে ঘর এবং মন্দিরে পূজা করা হয়। দক্ষিণাকালী করালবদনা, ঘোরা, মুক্তকেশী, চতুর্ভূজা এবং মুণ্ডমালাবিভূষিতা। তাঁর বামকরযুগলে সদ্যছিন্ন নরমুণ্ড ও খড়্গ; দক্ষিণকরযুগলে বর ও অভয় মুদ্রা। তাঁর গাত্রবর্ণ গভীর নীল, আকাশ এবং নীল সমুদ্রের ন্যায়; তিনি দিগম্বরী। তাঁর গলায় মুণ্ডমালার হার; কর্ণে দুই শবরূপী কর্ণাবতংস; কটিদেশে নরহস্তের কটিবাস। তাঁর দন্ত উজ্জ্বল শ্বেতবর্ণ; তাঁর স্তনযুগল উন্নত; তিনি ত্রিনয়নী এবং মহাদেব শিবের বুকে দণ্ডায়মান। তিনি মহাভীমা, হাস্যযুক্তা ও মুহুর্মুহু রক্তপানকারিনী। তাঁর, দীর্ঘ এবং কালো চুল সভ্যতা থেকে প্রকৃতির স্বাধীনতার প্রতিনিধিত্ব করে। দক্ষিণা কালীর তৃতীয় চক্ষুর নিচে সূর্য, চন্দ্র এবং অগ্নির প্রতীক দেখা যায় এবং এটি প্রকৃতির চালিকা শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে।
তাঁর জিহ্বা আসক্তির ও লোলুপতার প্রতীক এবং সাদা দাঁত সত্যতার প্রতীক। তাঁর জিহ্বা দাঁত দ্বারা দমিত। এটি সত্য দ্বারা লোভ নিয়ন্ত্রণের প্রতীক। উপাসকমণ্ডলী অনুযায়ী তিনি দিব্য মাতৃকা শক্তি বা পরম ও সর্বোচ্চ ঈশ্বর এবং চূড়ান্ত সত্য। তাঁর গলায় মুণ্ডমালার হার প্রজ্ঞার মাল্য এবং হয় ৫১ বা ১০৮ মানুষের মাথা আছে। সংস্কৃত ভাষায় ৫১ বর্ণমালা ও ১০৮ একটি সুপ্রসন্ন সংখ্যা।

তাঁর উপরের বাম হাতে খড়্গ শক্তির প্রতীক এবং নিচের বাম হাতে সদ্যছিন্ন নরমুণ্ড অহংএর প্রতীক। তাঁর খড়্গে একটি চোখ দেখা যায়। এটি প্রজ্ঞার প্রতীক। কালীর শক্তি খড়্গ জ্ঞান দ্বারা মানুষের অহং ছিন্ন করেন। দক্ষিণা কালী দক্ষিণকরযুগলে বর ও অভয় দান করছেন। এই দুই হাতের মানে হল, একটি সত্য হৃদয় দিয়ে যে কেউ তাঁর পূজা করতে পারেন।
দক্ষিণা কালী তাঁর কোমরের উপর ছিন্ন হাতের একটি ঘের পরেন যার মানে তিনি মানুষের কর্ম থেকে স্বাধীন এবং উচ্চতর।

ভগিনী নিবেদিতা তাঁর মাতৃরূপা কালী বইতে নিবেদিতা দেবী দক্ষিণেশ্বরের কালীর কথা আলোচনা করেছেন। দক্ষিণেশ্বরের কালী দক্ষিণা কালী। তাঁর পূজা করলে ত্রিবর্ণা তো বটেই সর্বোপরি সর্বশ্রেষ্ঠ ফলও দক্ষিণাস্বরূপ পাওয়া যায়।

শক্তিপীঠ বিমলা


কালিকাপুরাণ মতে, চার মহাপীঠ তন্ত্রসাধনার কেন্দ্র। এগুলির মধ্যে পশ্চিমদিকের পীঠটি হল ওড্ডীয়ন বা উড্ডীয়ন অঞ্চলের কাত্যায়নী। এই পীঠের ভৈরব জগন্নাথ। বুঝে নিতে অসুবিধে হয় না, এই ওড্ডীয়ন বা উড্ডীয়ন হল আজকের ওড়িশা। আর এই কাত্যায়নী হলেন শ্রীক্ষেত্র জগন্নাথ ধামের রক্ষয়িত্রী দেবী বিমলা। পীঠশক্তি রূপে কাত্যায়নীর নাম পাওয়া যায় হেবজ্র তন্ত্র গ্রন্থেও। সেখানে তাঁকে বলা হয়েছে উড্র পীঠের ভৈরবী। আর সেখানেও ভৈরব হলেন জগন্নাথ।

দক্ষকন্যা সতীর উপাখ্যান ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে হিন্দুদের একাধিক পুরাণে ও লোককথায়। ব্রহ্মার মানসপুত্র দক্ষ প্রজাপতির ছিল আট মেয়ে। তাঁদের মধ্যে সবার বড়ো ছিলেন সতী। দক্ষ সতীকে শিবের হাতে সমর্পণ করেছিলেন। শিব শ্বশুরকে যথোচিত সম্মান করতেন না। বরং শ্বশুরের সামনেই তাঁর অশেষ গুণাবলির নিদর্শন স্থাপন করতেন। এজন্য দক্ষও তাঁর এই জামাইটির প্রতি বিশেষ সন্তুষ্ট ছিলেন না। সঙ্গে সঙ্গে সতীও হয়ে উঠেছিলেন বাবার বিশেষ অনাদরের পাত্রী। দক্ষ তাঁর অন্য মেয়ে-জামাইদের বাড়িতে ডাকতেন। কিন্তু শিব-সতীকে কখনই ডাকতেন না। সতীর বিয়ের কিছুদিন পরে দক্ষ এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। যথারীতি সেই যজ্ঞে তিনি অন্যান্য মেয়ে-জামাইদের আমন্ত্রণ জানালেন; শুধু ডাকলেন না শিব-সতীকে। সতী লোকমুখে জানলেন বাবার যজ্ঞ আয়োজনের খবর। তিনিও যজ্ঞস্থলে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। শিব বারণ করলেন। সতী শুনলেন না। অনাহত হয়ে সটান যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হয়ে দক্ষকে প্রশ্ন করে বসলেন, ‘বাবা, দেবাদিদেব মহাদেব কেন এই যজ্ঞে আমন্ত্রিত হননি?’ দক্ষ উত্তরে বললেন, ‘শিব সংহারের দেবতা। তাই তিনি অমঙ্গল বয়ে আনতে পারেন। তাছাড়া তাঁর বেষভূষাও ভদ্রজনোচিত নয়। তিনি শ্মশানচারী। ভূতপ্রেত তাঁর নিত্যসঙ্গী। সেই সব নগ্ন অনুচরবৃন্দের সম্মুখে তিনি নানান কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করে থাকেন। তাঁকে নিমন্ত্রণ করলে সমবেত সুধী দেবমণ্ডলীর সামনে আমাকেও অপ্রস্তুত হতে হবে। সেই কারণেই শিবকে এই যজ্ঞে নিমন্ত্রণ করা হয়নি।’ মঙ্গলময় জগদ্‌গুরু শিব। তায় তিনি তাঁর প্রাণের ঠাকুর। বাপের মুখে পতিনিন্দা সতীর প্রাণে শেলের মতো বিঁধল। যজ্ঞাগ্নিতে সতী-দেহ আহুতি দিলেন শিবানী। সতীর দেহত্যাগের সংবাদ পৌঁছালো দেবাদিদেবের কানে। ক্রোধে উন্মত্ত দেবাদিদেব বীরভদ্র, ভদ্রকালী প্রমুখ অনুচরবৃন্দকে দিয়ে দক্ষযজ্ঞ পণ্ড করালেন। কন্যার দেহত্যাগের কারণ দক্ষের মুণ্ডচ্ছেদ করলেন। তারপর সতীর অর্ধদগ্ধ দেহ কাঁধে তুলে উন্মত্তের মতো ছুটে বেড়াতে লাগলেন এলোক থেকে সেলোক। ত্রিভুবন ধ্বংস হওয়ার জোগাড় হল তাঁর ক্রোধের তেজে। তাই আসরে নামতে হল বিষ্ণুকে। সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ খণ্ড খণ্ড করে ছড়িয়ে দিলেন পৃথিবীর নানা প্রান্তে। সতীদেহের অন্তর্ধানে শান্ত হলেন শিব। বসলেন মহাধ্যানে।
এদিকে সতীর দেহের খণ্ডগুলি ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে জন্ম দিল এক এক মহাপীঠের। শক্তিপীঠগুলির সংখ্যা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। পীঠনির্ণয় ও তন্ত্রচূড়ামণি মতে পীঠের সংখ্যা ৫১। শিবচরিত মতে ৫১ পীঠ ও ৫১ উপপীঠ। আবার সর্বশ্রেষ্ঠ শাক্ত পুরাণ দেবীভাগবত মতে ১০৮ পীঠ। বিমলা শক্তিপীঠের উল্লেখ বেশ কয়েকটি প্রধান গ্রন্থে পাওয়া যায়। আবার এই পীঠকে একাধিক নামেও চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যায়।
তন্ত্রচূড়ামণি গ্রন্থের ‘পীঠনির্ণয়’ বা ‘মহাপীঠনির্ণয়’ অংশে উৎকলের বিরজা ক্ষেত্রকে শক্তিপীঠ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পীঠের শক্তি বিমলা ও ভৈরব জগন্নাথ। সতীর নাভি এখানে পড়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে এই গ্রন্থে। তন্ত্রচূড়ামণি গ্রন্থেই অন্য একটি অধ্যায়ে অবশ্য বিমলাকে উপপীঠ বলে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এখানে সতীর উচ্ছিষ্ট পড়েছিল। তন্ত্রচূড়ামণি মন্দিরের অবস্থান উল্লেখ করতে গিয়ে ‘নীলাচল’ কথাটির উল্লেখ করেছে। নীলাচল বা নীলপর্বতের উল্লেখ শিবচরিত গ্রন্থেও পাওয়া যায়। এই গ্রন্থেও বিমলা উপপীঠ। এখানকার শক্তি বিমলা ও ভৈরব জগন্নাথ। উল্লেখ্য, নীলাচল নামটি জগন্নাথ ক্ষেত্রের সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে যুক্ত। সতীর উচ্ছিষ্ট পড়ার ঘটনার সঙ্গে জগন্নাথের উচ্ছিষ্ট ভোগে বিমলার পূজার কোনো যোগ থাকাও অসম্ভব নয়। তবে সেসব গবেষকদের আলোচনার বিষয়।
ফিরে আসি অন্যান্য তন্ত্র ও পুরাণ গ্রন্থগুলির আলোচনায়। কুব্জিকাতন্ত্র বলে, বিমলা ৪২টি সিদ্ধপীঠের একটি। এখানে সাধনা করলে সিদ্ধাই নামে এক ধরনের অলৌকিক ক্ষমতা লাভ করা সম্ভব। দেবীভাগবত পুরাণ, প্রাণতোষিণী তন্ত্র ও বৃহৎ নীলতন্ত্র মতে, বিমলা ১০৮ শক্তিপীঠের অন্যতম। দেবীপুরাণ মতে, এখানে পড়েছিল সতীর পা। মৎস্যপুরাণ মতে, পুরুষোত্তম ক্ষেত্রের বিমলা একটি শক্তিপীঠ। বামনপুরাণ মতেও এটি একটি মহাতীর্থ। মহাপীঠ নিরুপণ গ্রন্থে বিমলা ও জগন্নাথকে এই তীর্থের পীঠদেবতা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মহাশক্তির ১০৮ পৌরাণিক নামের তালিকা নামাষ্টত্তরশত গ্রন্থেও পুরুষোত্তম ক্ষেত্রের বিমলার উল্লেখ পাওয়া যায়।
শক্তিপীঠ বিমলা
এখানে একটি প্রশ্ন ওঠা খুব স্বাভাবিক। ‘ভৈরব’ শব্দটি ও শাক্ত-তান্ত্রিক শক্তিপীঠের ভৈরব ধারণাটির সঙ্গে সাধারণত যে দেবতার সম্পর্ক তিনি দেবাদিদেব মহাদেব। নারায়ণ বা কৃষ্ণ নন। রামানুজী বিশিষ্টাদ্বৈত বা চৈতন্য-অনুসারী গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনে পুরীর জগন্নাথ নারায়ণ বা কৃষ্ণের স্বরূপ। বিভিন্ন শাস্ত্রেও দেবী বিমলাকে কাত্যায়নী, দুর্গা, ভৈরবী, ভুবনেশ্বরী বা একানংশা দেবী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নারায়ণ-পত্নী লক্ষ্মী বা কৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি শ্রীরাধার সঙ্গে বিমলার কোনো সাদৃশ্য আদৌ দেখা যায় না। তবে কেন জগন্নাথকে ভৈরব বলা হল? কেনই বা তিনি দুর্গা-স্বরূপা বিমলার ভৈরব হলেন?
এর দুটি ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। একটি অদ্বৈত একেশ্বরবাদী ব্যাখ্যা। এই ব্যাখ্যা অনুসারে, শিব ও বিষ্ণু অভিন্ন। তাই শিবশক্তি দুর্গা ও বিষ্ণুশক্তি লক্ষ্মীও অভিন্না। সেই অর্থেই জগন্নাথ বিমলার ভৈরব। তবে এই ব্যাখ্যা ততটা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, বিমলার সঙ্গে  শৈব-তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের যোগ যতখানি, অদ্বৈত সম্প্রদায়ের যোগ ততখানি নয়। তন্ত্র মতে, জগন্নাথ নারায়ণ বা কৃষ্ণের নয়, শিবের রূপ। সেই জন্যই তিনি শিব-ভৈরব। মনে হয়, এই কারণেই তন্ত্রগ্রন্থগুলিতে জগন্নাথকে ভৈরব আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আর তাই শাক্ত বিশ্বাসে দেবী বিমলা হয়ে উঠেছেন পুরুষোত্তম শক্তিপীঠের প্রধান দেবী তথা জগন্নাথ মন্দিরের রক্ষয়িত্রী।

এ তো গেল শাস্ত্রের কথা। কিন্তু ইতিহাস কী বলে?
ইতিহাস বলে, বিমলা মন্দিরের ইতিহাস সম্ভবত বৈষ্ণব জগন্নাথ-কাল্টের চেয়েও প্রাচীন। জগন্নাথ মন্দিরের বর্তমান কাঠামোটি খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীর পরে নির্মিত। অথচ বর্তমান বিমলা মন্দিরটি খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীতে পূর্ব গঙ্গ রাজবংশের রাজত্বকালে নির্মিত। তাও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের ফলে জানা গিয়েছে খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে নির্মিত আদি বিমলা মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের উপরই গড়ে উঠেছে নবম শতাব্দীর এই মন্দিরটি। জগন্নাথ মন্দিরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে রোহিণীকুণ্ডের পাশে অবস্থিত বিমলা মন্দিরের সঙ্গে মন্দির চত্বরের মুক্তিমণ্ডপের কাছে অবস্থিত নৃসিংহ মন্দিরের স্থাপত্যগত মিলটি বেশ লক্ষণীয়। মাদলা পাঁজি বলছে, দক্ষিণ কোশলের সোমবংশী রাজবংশের রাজা যযাতি কেশরী এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা।  উল্লেখ্য, এই বংশের রাজা প্রথম যযাতি (খ্রিস্টীয় ৯২২–৯৫৫) ও দ্বিতীয় যযাতি (খ্রিস্টীয় ১০২৫–১০৪০) উভয়েই “যযাতি কেশরী” নামে পরিচিত ছিলেন। মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী–বিশেষত পার্শ্বদেবতাদের মূর্তি ও মূল মূর্তিটির পিছনের পাথরের খণ্ডটি সোমবংশী শৈলীর নিদর্শন বহন করে। হয়তো এগুলি আদি মন্দিরেরই অংশ ছিল। তাই বলাই যায়, চত্বরের প্রধান মন্দির জগন্নাথ মন্দিরের তুলনায় দেবী বিমলার মন্দির প্রাচীনতর।
খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে আদি শঙ্করাচার্য পুরীতে গোবর্ধন মঠ স্থাপন করেছিলেন বিমলাকে প্রধান দেবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। প্রথা অনুসারে, আজও গোবর্ধন মঠের অধ্যক্ষ পুরীর শঙ্করাচার্য বিমলা মন্দিরের প্রসাদ হিসেবে এক থালা মহাপ্রসাদ ও এক থালা খিচুড়ি ভোগ রোজ পেয়ে থাকেন। দ্য জগন্নাথ টেম্পল অ্যাট পুরী গ্রন্থের লেখক স্টারজার মতে, প্রাচীনকালে জগন্নাথ মন্দির ছিল ত্রিমূর্তি অর্থাৎ ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবপূজার কেন্দ্র। এই তিন দেবতার শক্তি তথা হিন্দুধর্মের প্রধান তিন দেবী সরস্বতী, লক্ষ্মী ও পার্বতীও তাই পূজিত হতেন জগন্নাথ মন্দিরে। তার মধ্যে দেবী পার্বতীর পূজা হত বিমলা রূপে। খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত পুরীতে শ্রীবিদ্যা উপাসনার প্রাবল্য লক্ষিত হয়েছে। পরবর্তীকালে বৈষ্ণবধর্ম জগন্নাথ মন্দির চত্বরে প্রাধান্য বিস্তার করে। কমে যায় শ্রীবিদ্যা ও শৈব-তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের প্রভাব। তবে এই প্রভাব একেবারেই অবলুপ্ত হয়নি। তান্ত্রিক পঞ্চমকার উপচারের বদলে বিমলা মন্দিরে নিরামিশ ভোগ ও দেবদাসী নৃত্যের প্রথা চালু হয়েছিল। তবে মাছভোগ দেবার প্রথাটি বজায় ছিল। রাজা নরসিংহদেব (শাসনকাল ১৬৩২–৪৭ খ্রিস্টাব্দ) মন্দিরে মাছ ও মাংস ভোগের প্রথা বন্ধ করে দেন। পরবর্তীকালে অবশ্য সেই প্রথা আবার চালু হয়। বর্তমানে বিমলা মন্দিরের জন্য সাধারণত আলাদা ভোগ রান্না করা হয় না। জগন্নাথের নিরামিশ ভোগই দেবী বিমলাকে নিবেদন করা হয়। শুধু দুর্গাপূজার সময় দেবীকে আমিষ ভোগ দেবার প্রথা রয়েছে। এই সময় খুব ভোরে গোপনে মন্দিরে পাঁঠাবলিও হয়। স্থানীয় মার্কণ্ড মন্দিরের জলাশয় থেকে মাছ ধরে এনে রান্না করে বিমলাকে নিবেদন করা হয়। পূজা হয় তন্ত্র মতে। এই সব অনুষ্ঠান ভোরে জগন্নাথ মন্দিরের দরজা খোলার আগেই সেরে ফেলা হয়। বৈষ্ণব ও স্ত্রী ভক্তদের এই সময় বিমলা মন্দিরে ঢুকতে দেওয়া হয় না। অনুষ্ঠানের অল্প কয়েকজন দর্শকই শুধু “বিমলা পারুষ” বা বিমলার আমিষ ভোগ পান। দেবী বিমলার ভক্তদের বিশ্বাস, দুর্গাপূজায় দেবী উগ্রমূর্তি ধারণ করেন। সেই সময় তাঁকে শান্ত করতে আমিষ ভোগ দিতেই হয়। যদিও এই মন্দিরে পশুবলি ও আমিষ ভোগ নিবেদন নিয়ে বৈষ্ণবদের আপত্তিও সুবিদিত।
বেলেপাথর ও ল্যাটেরাইটে নির্মিত বিমলা মন্দিরের স্থাপত্যশৈলীটি কলিঙ্গ স্থাপত্যশৈলীর দেউল রীতির নিদর্শন। মন্দিরের চারটি অংশ: বিমান (গর্ভগৃহ যে অংশে অবস্থিত), জগমোহন (সভাঘর), নাটমণ্ডপ (উৎসবাদির স্থান) ও ভোগমণ্ডপ (ভোগ ও বিনোদনের স্থান)। এর মধ্যে বিমান অংশটি রেখ দেউল। এর আকার শম্বুকাকৃতির চিনির ডেলার মতো। বিমলা মন্দিরের বিমানটির উচ্চতা ৬০ ফুট। গায়ে নানারকম ছবি খোদাই করা। কেন্দ্রীয় গর্ভগৃহে রাখা আছে দেবী বিমলার মূর্তিটি। দেবী এখানে চতুর্ভূজা। তাঁর তিন হাতে জপমালা, বরমুদ্রা ও অমৃতকুম্ভ। চতুর্থ হাতের বস্তুটি ঠিক কী, তা নিয়ে মতান্তর দেখা যায়। তবে দেবী দুর্গার যে মূর্তি আমরা সচরাচর দেখতে অভ্যস্থ, দেবী বিমলার মূর্তি আদৌ সে রকম নয়। শুধু দেবী পার্বতীর দুই সখি জয়া ও বিজয়াকে দেবী বিমলার দুই পাশে দেখা যায়। মূর্তির উচ্চতা ৪ ফুটের কিছু বেশি।
বিমানের বাইরে জগমোহন, নাটমণ্ডপ ও ভোগমণ্ডপও নানারকম খোদাইচিত্রে শোভিত। বিমানে তিনটি কুলুঙ্গি আছে। তার একটিতে অষ্টভূজা মহিষমর্দিনী ও আর একটিতে ষড়ভূজা চামুণ্ডার মূর্তি দেখা যায়। তৃতীয় কুলুঙ্গিটি খালি। সম্ভবত সেখানকার দেবীমূর্তিটি চুরি গিয়েছে। জগমোহনের বৈশিষ্ট্য এর পিরামিড-আকৃতির ছাদ। নাটমণ্ডপে দশমহাবিদ্যা সহ মোট ষোলোজন হিন্দু দেবীর মূর্তি অঙ্কিত আছে। ভোগমণ্ডপের কুলুঙ্গিতে আছে অষ্টভূজ গণেষ ও ষড়ানন কার্তিকের মূর্তি। এছাড়া ভোগমণ্ডপের প্রবেশপথের মাথায় দাঁড়িয়ে আছে দেবী বিমলার বাহন গজসিংহ – পরাজিত হাতির উপর দাঁড়ানো বিজয়দর্পে গর্বিত এক সিংহ।
২০০৫ সালে বিমলা মন্দির সংস্কার করা হয়েছে। বর্তমানে এটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার ভুবনেশ্বর সার্কেল।
বিমলা মন্দিরের প্রধান উৎসব দুর্গাপূজা। প্রতি বছর আশ্বিন মাসে ষোলোদিন ধরে মন্দিরে উদযাপিত হয় দুর্গাপূজা। পুরীর রাজা বিজয়াদশমীর দিন বিমলাকে মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গার রূপে পূজা করেন। এই মন্দিরের দুর্গাপূজার সবচেয়ে পুরনো উল্লেখটি পাওয়া যায়এখন নতুন দিল্লিতে রাখা কোণার্ক শিলালিপিতে (খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দী)। এই শিলালিপির তথ্য অনুসারে, রাজা প্রথম নরসিংহদেব (রাজত্বকাল: ১২৩৮–১২৬৪) বিজয়াদশমীর দিন দুর্গা-মাধব (বিমলা-জগন্নাথ) পূজা করেছিলেন। হিন্দুধর্মের সনাতন বিশ্বাস, মেয়েরা কোমলস্বভাব। তাই বিমলার উগ্রমূর্তি মহিষাসুরমর্দিনীর পূজা আজও দেখতে দেওয়া হয় না মেয়েদের।
বিমলা মন্দিরের একটি বৈশিষ্ট্য হল, জগন্নাথের প্রসাদী নারকেল বাটা, পনির ও মাখন দিয়ে শুকনো ভাত দিয়ে দেবী বিমলার নিত্যভোগের ব্যবস্থা। দুর্গাপূজার আমিষ ভোগ রান্নার ব্যবস্থা ছাড়া বিমলা মন্দিরের জন্য পৃথক ভোগ রান্নার ব্যবস্থা নেই। উচ্ছিষ্ট ভোগে হিন্দুধর্মে দেবদেবীর পূজা নিষিদ্ধ। তবে বিমলা মন্দিরে কেন এই ব্যবস্থা? ওড়িশায় একটি লোকশ্রুতি আছে এই নিয়ে। বৈকুণ্ঠে নারায়ণ-দর্শনে গিয়েছেন দেবাদিদেব মহাদেব। নারায়ণ তখন খেতে বসেছেন। মহাদেব দেখলেন, নারায়ণের থালা থেকে তাঁর ভোজ্যের কয়েক টুকরো উচ্ছিষ্ট পড়েছে মাটিতে। প্রসাদজ্ঞানে সেই উচ্ছিষ্ট তুলে মুখে দিলেন মহাদেব। সেসময় তাঁর অনবধানে কিছুটা লেগে রইল তাঁর দাড়িতে। কৈলাশে ফেরার পর মহাদেব দেখলেন, তাঁর পথ চেয়ে অপেক্ষা করে আছেন দেবর্ষি নারদ। নারদ দেখলেন মহাদেবের দাড়িতে লেগে আছে ভোজনাবশেষ। তিনি জানতেন, মহাদেব গিয়েছিলেন বৈকুণ্ঠে নারায়ণ-সন্দর্শনে। দুইয়ে দুইয়ে চার করলেন নারদ। তাঁর বুঝতে দেরি হল না, মহাদেব যাঁর শ্রেষ্ঠ ভক্ত, সেই নারায়ণেরই উচ্ছিষ্ট লেগে রয়েছে মহাদেবের দাড়িতে। তিনি চকিতে সেই উচ্ছিষ্ট তুলে নিয়ে মুখে দিলেন। ঘটনাটি নজর এড়ালো না শিবপত্নী পার্বতীর। ক্ষুণ্ণ হলেন তিনি। সোজা চলে এলেন বৈকুণ্ঠে। নালিশ জানালেন, নারায়ণ-প্রসাদে তাঁর ন্যায্য পাওনা থেকে দেবর্ষি তাঁকে বঞ্চিত করেছেন। তখন পার্বতীকে শান্ত করে নারায়ণ বললেন, “দেবী, দুঃখ কোরো না। কলিযুগে বিমলা রূপে নিত্য আমার প্রসাদ পাবে তুমি।” ভক্তেরা বলেন, সেই থেকে পুরীর মন্দিরে জগন্নাথের প্রসাদী অন্নে বিমলার পূজার নিয়ম।  উল্লেখ্য, জগন্নাথের প্রসাদ বিমলাকে উৎসর্গ করার পরই তা পায় মহাপ্রসাদের মর্যাদা।
শাক্ত সম্প্রদায়ের কাছে বিমলা মন্দির একটি মহাতীর্থ। ওড়িশাবাসী শাক্তদের কাছে বিমলা প্রধান শাক্ততীর্থ। তান্ত্রিকদের কাছে তো এই মন্দিরের গুরুত্ব মূল জগন্নাথ মন্দিরের চেয়েও বেশি।  জগন্নাথ মন্দিরের প্রথা অনুসারে, মূল মন্দিরে জগন্নাথকে পূজা করার বিমলাকে পূজা করা হয়।  প্রতিদিন এই মন্দিরের গর্ভমন্দির মুখরিত হয় শ্রীশ্রীচণ্ডী, আদি শঙ্করাচার্যের ‘দেব্যাপরাধক্ষমাপণ স্ত্রোত্র’ ও পুরুষোত্তম রক্ষিতের ‘বিমলাষ্টক স্তোত্রে’র সুরে। সন্তান আকুতি জানান, “মা, তোমার চরণসেবা করিনি কোনোদিন। কোনোদিন কিছুই ভালবেসে তুলে দিই নি তোমার হাতে। তবু আমাকে তোমার স্নেহের ছায়া থেকে কোনোদিন বঞ্চিত করোনি তুমি। আমি জানি, কুপুত্র জন্মায়, কিন্তু কুমাতা কখনও হয় না। আমার মতো পাপী আর কেউ নেই। তোমার মতো পাপঘ্নীও কেউ নেই। তাই হে জগজ্জননী, এরূপ জেনে যা উচিত তাই করো!”

ব্রহ্মা

ব্রহ্মা  হিন্দুধর্মে সৃষ্টির দেবতা। বিষ্ণু ও শিবের সঙ্গে তিনি ত্রিমূর্তিতে বিরাজমান। তিনি অবশ্য হিন্দু বেদান্ত দর্শনের সর্বোচ্চ দিব্যসত্ত্বা ব্রহ্মের সমরূপ নন। বরং বৈদিক দেবতা প্রজাপতিকে ব্রহ্মার সমরূপ বলা চলে। বিদ্যাদেবী সরস্বতী ব্রহ্মার স্ত্রী।

নাম
সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুসারে, মূল বিশেষ্য প্রাতিপদিক ব্রহ্মন্ শব্দটি থেকে দুটি পৃথক বিশেষ্য সৃষ্টি হয়েছে। একটি ক্লীব বিশেষ্য ব্রহ্মন্ ; এই শব্দের কর্তৃপদমূলক একবচন রূপটি হল ব্রহ্ম (সংস্কৃত: ब्रह्म)। এই বিশেষ্যটির একটি সাধারণ ও বিমূর্ত অর্থ রয়েছে।
এর বিপরীতে রয়েছে পুং বিশেষ্য ব্রহ্মন্ । এই শব্দের কর্তৃপদমূলক একবচন রূপটিই হল ব্রহ্মা (সংস্কৃত: ब्रह्मा)। এই শব্দটি ব্যক্তিনাম ও হিন্দু সৃষ্টিদেবতার নাম হিসেবে ব্যবহৃত। এঁকে নিয়েই আমাদের বর্তমান নিবন্ধ।
ব্রহ্মা মালয় ভাষায় বেরাহমা ও থাই ভাষায় ফ্রা ফ্রোম নামে পরিচিত। বাংলা ভাষায় লোকমুখে তাঁকে বহরম বা বিরিঞ্চি-ও বলা হয়ে থাকে
ধ্যানমন্ত্র
ব্রহ্মা কমণ্ডলুধরশ্চতুর্বক্রশ্চতুর্ভুজঃ।
কদাচিৎরক্তকমলে হংসারূঢ়ঃ কদাচন।।
বর্ণেন রক্তগৌরাঙ্গঃ প্রাংশুস্তুঙ্গাঙ্গ উন্নতঃ
কমণ্ডলুর্বামকরে স্রুবো হস্তে তু দক্ষিণে।
দক্ষিণাধস্তথা মালা বামাধশ্চ তথা স্রুবঃ।
আজ্যস্থালী বামপার্শ্বে বেদাঃ সর্বেহগ্রত স্থিতাঃ।।
সাবিত্রী বামপার্শ্বস্থা দক্ষিণস্থা সরস্বতী।
সর্বে চ ঋষয়োহ্যগ্রে কুর্যাদেভিশ্চ চিন্তনম।।

অর্থঃ ব্রহ্মা কমণ্ডলুধারী, তাঁর চারটি মুখ। তিনি কখনও লাল পদ্মে, কখনও শ্বেতহংসের উপর আসীন। তাঁর গায়ের রং লাল গৌরবর্ণ। তিনি লম্বা এবং উন্নত অঙ্গধারী। তাঁর উপরের বামহাতে কমণ্ডলু, ডানহাতে স্রুব। নিচের বামহাতে স্রুব এবং ডানহাতে জপমালা। তাঁর বামপাশে আজ্যস্থালী এবং সম্মুখে বেদসকল এবং ঋষিগণ। ব্রহ্মার বামপাশে সাবিত্রী এবং ডানপাশে সরস্বতী দেবী বিরাজিতা। ঋষিগণ এভাবেই ব্রহ্মার ধ্যান করেন।

পৌরাণিক উপাখ্যান
সৃষ্টির প্রারম্ভে ব্রহ্মা প্রজাপতিদের সৃষ্টি করেন। এই প্রজাপতিরাই মানবজাতির আদিপিতা। মনুস্মৃতি গ্রন্থে এই প্রজাপতিদের নাম পাওয়া যায়। এঁরা হলেন মারীচি, অত্রি, অঙ্গিরস, পুলস্ত, পুলহ, ক্রতুজ, বশিষ্ঠ, প্রচেতস বা দক্ষ, ভৃগু ও নারদ। সপ্তর্ষি নামে পরিচিত সাত মহান ঋষির স্রষ্টা ব্রহ্মা। এঁরা তাঁকে বিশ্বসৃষ্টির কাজে সহায়তা করেন। তাঁর এই পুত্রগণ তাঁর শরীর থেকে জাত হননি, হয়েছেন তাঁর মন থেকে। এই কারণে তাঁদের মানসপুত্র বলা হয়।
বেদ ও পুরাণ শাস্ত্র অনুসারে, ব্রহ্মা দেবতাদের বিষয়ে হস্তক্ষেপ বেশি করেন। নশ্বরদের ক্ষেত্রে তাঁর হস্তক্ষেপের ঘটনা অপেক্ষাকৃত কম। তিনি সোমের উপর চাপ সৃষ্টি করে তারকাকে তাঁর স্বামী বৃহস্পতির নিকট ফিরিয়ে দিতে বাধ্য করেন। তাঁকে ধর্ম ও অত্রির পিতারূপেও কল্পনা করা হয়